করোণা সচেতনতায় শিক্ষার্থীদের উদ্দ্যেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের খোলা চিঠি

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) রবিবার (২২ মার্চ) সকাল পর্যন্ত এক দিনে ১ হাজার ৬৬৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এতে মোট মৃতের সংখ্যা ১৩ হাজার ৫০ জনে পৌঁছেছে। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৯৫ হাজার ৭৯৭ জন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানিয়েছে, উৎপত্তিস্থল চীন ছাড়াও বিশ্বের মোট ১৮৮টি দেশে মরণঘাতী ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। তাছাড়া ঝুঁকিতে আছে আরও অনেক দেশ।

এতে বিশ্বজুড়ে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ৮ হাজার ছাড়িয়েছে। যাদের মধ্যে ইতালি, ইরান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এমন অবস্থায় বিশ্বজুড়ে সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করতে দেশব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এবার করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা এবং করণীয় জানিয়ে  শিক্ষার্থীদের উদ্দ্যেশ্য খোলা চিঠি লিখেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক রিয়াজুল ইসলাম।  তিনি খোলা চিঠিতে লিখেছেন,,,,,,,,

"প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ,

তোমাদের উদ্দেশ্য কখনোই পত্র লিখিনী, খোলা চিঠি সেটাতে প্রশ্নই আসেনা। তবে, আজ বরাবর কেন যেন মনে হচ্ছে তোমাদের উদ্দেশ্য কিছু একটা লেখা দরকার। সত্যি বলতে কী, এখন জাতির ক্রান্তিলগ্ন চলছে, এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু করার আছে। আজ আমার ছোট্ট বার্তার মাধ্যমে একজনও যদি মহামারী করোনা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে তাহলে আমার এ বার্তা স্বার্থক ও সুন্দর হবে।নিশ্চয় এই মহামারীর সময়ে তুমি, তোমরা মোটেই ভালো নেই! আমি ও ভালো নেই। বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ও আপনজন, আমার নিকট তিনি নিরেট ভালো মানুষ, মহীরুহ স্বরুপ, সেই বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী প্রফেসর ড.ওসমান গণি তালুকদার স্যারকে ফোন দিয়েছিলাম। ফোন দিয়ে স্যারকে বললাম, স্যার- দেশের পরিস্থিতি কেমন? স্যার সহজভাবে বললেন, দেখো, এখন তোমরা কিছুটা ১৯৭১ সালের অবস্থা অনুভব করতে পারবে। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, কেন স্যার? স্যার বললেন দেখো ১৯৭১ সালে আমরা কেউ ঘরে থাকতে পারিনি, আত্মীয়-স্বজন, ভাই, বোনদের কোথায় কে পালিয়ে বেড়াতো, লুকিয়ে থাকতো তা কেউ জানতে পারতো না! আমরা সবাই শুধু ঘরে ফেরার জন্য, দেশ  স্বাধীন হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতাম। আর এখন হয়েছে তার উল্টোটা, আমরা সবাই ঘরে। কেউ জানিনা, বাইরে বের হওয়ার পরিপূর্ণ স্বাধীনতা কবে পাবো ।তখন লড়াই করতে হয়েছে পাক-হানাদারদের বিরুদ্ধে, আর এখন লড়াই করতে হচ্ছে করোনা নামক শত্রুর বিরুদ্ধে!!

প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ তুমি, আমি কেউ ১৯৭১ দেখিনি কিন্তু সবাই ২০২০ সাল দেখছি। তাহলে আমাদের বাংলার মুক্তিযোদ্ধারা কত কষ্টসহ্য করে বাংলা মা’কে মুক্ত করেছে, একবার ভেবে দেখো? আমার হাজার হাজার শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থান করছে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে দেখা হয় না মাত্র ৮ দিন, আর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে দেখা হয় না প্রায় ১ বছর, তবে কেন যেন মনে হচ্ছে তোমাদের সাথে দেখা হয় না হাজার বছর!! তোমাদের প্রশান্তিময় চেহারা, অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আর গালভরা হাসি না দেখলে মোটেই ভাল লাগেনা, তোমরাই যে আমাদের আত্মার স্পন্দন, হৃদয়ের শব্দ, আমাদের স্বপ্নের সোনার ছেলে-মেয়ে। তোমরা যে যেখানেই আছো সাবধানে থেকো। জানি, তোমাদের বয়সে এতো ছুটি পেলে আমিও পাশের বাসার বন্ধুর সাথে দেখা করতে যেতাম, তার সাথে হাত মেলাতাম, বুক আলতো ভাবে জড়িয়ে  নিতাম,চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে গল্পের ঝড় তুলে দিতাম, ফিরে যেতাম কৌশরের দুরন্তপনায়, খবর নিতাম পাশের গ্রামের বিলকিস এখনো আগের মতোই আছে কী না, মন্টর সাথে ঝগড়াটা মিটছে কী না, না মিটলে মিটিয়ে দিয়ে হয়তো বাড়ি ফিরতাম। ক্রিকেট খেলা থেকে শুরু করে বড়ো করে ফুটবল খেলার আয়োজন করতাম।

আমার প্রিয় সন্তানেরা, প্লিজ, প্লিজ এসব দুরন্তপনা এখন করনা। ‘মা’ আমাকে ফোনে বলেছে ‘মনি’ ঠিক থাকিস, নিজের যত্ন নিস, নামায পড়িস, আমি বলেছি “মা ” ও মা দোয়া করো তো যেন আমার হাজার হাজার শিক্ষার্থী ঠিক থাকে, তারা যেন সুস্থ থাকে। প্রিয় সন্তানেরা, তোমরা সর্তক হও, অতি দ্রুত তোমার- আমার দিকে ছুটে আসছে নোভেল করোনা! ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য প্রায় শেষ। সেখানে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। গবেষণা বলছে, সচেতন আর সর্তক না হলে লাখো লাখো বাংলাদেশী আক্রান্ত হতে পারে এ রোগে। তোমরা হয়তো জানো ১৯১৮-২০ সালে স্প্যানিস ফ্লুতে প্রায় ৫ কোটি মানুষ পৃথিবীব্যাপি মারা গিয়েছিল, এই ভাইরাসটি ও সেই ফ্লুর মতো ভয়াবহ। যেকোন ভাবেই হোক মহান আল্লাহর রহমতে আমাদের বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে, মনে রেখো তোমরা তরুণরাই বাংলার প্রাণ, তোমরাই শক্তি, তোমরা সাহস হারাবে না। সরকার অনেক চেষ্টা করছে, জনগণের সুরক্ষার জন্য, কিন্তু সরকার একা কিছুই করতে পারবেনা যদি আমরা সবাই সচেতন না হই। তাই ঘরে থাকো,ঘরে পড়ো, ঘরে খাও, ঘরে প্রতি ঘন্টায় হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত পরিষ্কার করো, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যেও না, যে কোন সময় বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার করো, আজ সামাজিকতা ছেড়ে একটু অসামাজিক হও, ঘরে বসে যে যার প্রভূর কাছে প্রার্থনা করো, যারা মুসলমান তারা আল্লাহ পাকের কাছে সাহায্য চাও, নামায পড়ো, মনে রেখো যুবকের দোয়া আল্লাহ বেশি কবুল করেন। পরিবার, ভাই -বোন, গ্রামবাসী সবাইকে সর্তক করো। জীবন একটাই, এই জীবনকে সুন্দর রাখার দায়িত্ব তোমার একান্ত নিজের। শুধু পানিতে ডুবলেই ডোবা বলেনা, জেগে থেকেও আমরা ডুবে যাবো যদি সর্তক না হই। তুমি, আমি কেউ জানিনা পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তবে আমরা সবাই যদি দূরত্ব বজায় রাখি, সাবধান হই তাহলে অচিরেই এই সমস্যার সমাধান হবে ইনশাআল্লাহ। অশেষ ভালবাসা ও শুভকামনা রইলো।। নিশ্চয় দেখা হবে বিজয়ে।"

ইতি,

তোমাদের মতোই শিক্ষার্থী

মোঃ রিয়াজুল ইসলাম 

প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জাককানইবি

মন্তব্য লিখুন :


আরও পড়ুন