বাংলাকে চিনতে হলে রবীন্দ্রনাথকে চিনতে হবে

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যিনি উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বাংলা সাহিত্য ভান্ডারকে সর্বোচ্চ সমৃদ্ধ করেছেন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী যিনি সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি অঙ্গনে বিচরণ করেছেন।

তিনি ছিলেন একাধারে বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সঙ্গীতকার, চিত্রশিল্পী, নাট্যকার, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক এবং সমাজ সংস্কারক। এক কথায় নানাবিধ প্রতিভার সম্বন্বয় ঘটেছিল তাঁর বর্ণময় দীর্ঘ কর্মজীবনে। কিন্তু তিনি মূলত কবি হিসেবেই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন। তাইতো তাকে কবিগুরু এবং বিশ্বকবি হিসেবে অভিহিত করা হয়।

বাংলা সাহিত্যের কাব্যকাননে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব ছিল ঊষালগ্নে নব প্রস্ফুটিত পুষ্পের ন্যায়।

মাত্র আট বছর বয়স থেকেই তিনি সাহিত্য লিখতে শুরু করেন। ১৮৭৪ সালে 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা 'অভিলাষ'। এরপর লিখতে শুরু করেন একের পর এক কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক ও গান।

তিনি ৫২ টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩ টি উপন্যাস, ৩৬ টি প্রবন্ধ, ৩৮ টি নাটক এবং ৯৫ টি ছোট গল্প সহ ১৯১৫ টি গান রচনা করেন যা তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়েছিল। 'গীতাঞ্জলি ' নামক কাব্যগ্রন্থের জন্য অর্জন করেন এশীয়দের মধ্যে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি বাংলা ভাষাকে নিয়ে গেছে অনন্য শিখরে।

এছাড়াও তিনি প্রায় আড়াই হাজারের বেশি চিত্রকর্ম অংকন করেন যার প্রায় পনেরশো এর অধিক বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত রয়েছে।

শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্য অঙ্গন নয় বাংলার সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক মায়ের সাথে সন্তানের নাড়ির টান এর সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথের জন্মকালীন (৭ ই মে,১৮৬১) তার জন্মস্থান ভারতবর্ষ ছিল অখন্ড। সেই ভারতবর্ষের কলকাতায় রবীন্দ্রনাথ যখন বেড়ে উঠতে শুরু করলেন তখন থেকেই পরিচিত হয়ে উঠছিলেন বাংলা, বাংলার মানুষ, বাংলার প্রকৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতির সাথে।

তৎকালীন বাঙালি সমাজ, সামাজিক অবস্থা, সমাজ চিত্র রবীন্দ্রনাথকে যেমন প্রভাবিত করছিলেন ঠিক একইভাবে বাংলার রুপ রবীন্দ্রনাথের মাঝে গভীর ভাবাবেগ সৃষ্টি করেছিলেন। এরপরে তিনি যখন পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল জমিদারি দেখাশোনার সূত্রে ভ্রমণ করেন মূলত এই বাঙালি সমাজ, সংস্কৃতি, সমাজচিত্র এবং বাংলার রূপ রবীন্দ্রনাথের লেখাকে আরও সৃষ্টিশীল করে তুলেছিল।

শাহজাদপুর, পতিসর, শিলাইদহে অবস্থানকালে তিনি তাঁর বিখ্যাত সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কল্পনা কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। গীতাঞ্জলি কাব্যের অনুবাদ শুরু করেন এবং বেশ কিছু ছোটগল্প রচনা করেন। ছোটগল্প গুলো এসব অঞ্চলের মানুষের জীবনচিত্র থেকে লেখা। এছাড়াও ছিন্নপত্রাবলী কাব্যের ৩৮ টি পত্র তিনি লিখেছিলেন এখানে বসেই।

ছোট গল্প গুলোতে তৎকালীন বাঙালি সমাজের বাস্তব চিত্র এমন ভাবে ফুটে উঠেছে যা সেসময়ের সমাজ চিত্র অনুভব করিয়ে দেয়। ছোটগল্প লেখনীর মাধ্যমে বাঙালি সমাজের গোঁড়ামি, ভ্রান্তি গুলোর প্রতি তিনি প্রতিবাদ প্রকাশ করেছিলেন। ছিন্নপত্র কাব্যে তিনি বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ এবং বাংলার প্রকৃতিকে অনন্য সাধারণ ভাবে প্রতিটি চিঠিতে উপস্থাপন করেছেন যা পাঠকের অবচেতন মনে এক স্পষ্ট ছবি এঁকে দিবে। গ্রামের সন্ধ্যা, ছলছল করে বয়ে যাওয়া পদ্মা, নির্জন দুপুর, গ্রামের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, বিভিন্ন রকম গাছগাছালির সমাহার, ভাঙাচোরা ঘাট,পাড়ে রাখা নৌকো এসব কিছুর বর্ণনা শুধু বাংলা কে নয় রবীন্দ্রনাথকেও অন্য রকম ভাবে প্রকাশ করেছিল।

বাংলার বর্ষা রবীন্দ্রনাথকে এমন ভাবে প্রভাবিত করেছিল যে তিনি বর্ষাপ্রেমী হয়ে বর্ষা কেন্দ্রিক অসংখ্য গান এবং কবিতা রচনা করেন যার মাঝে উল্লেখযোগ্য,"আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদলও দিনে.., পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে পাগল আমার মন বেজে ওঠে..,শাওনো গগণে ঘোর ঘানাঘটা..,ওগো সাঁওতালি ছেলে শ্যামল সঘন নব বরষার কিশোর দূত কি এলে.."

গীতবিতানের বর্ষার প্রথম গানে কবি বর্ষাকে আবাহন করেছেন শ্যামল সুন্দর বলে। তাপ শুষ্ক পৃথিবীকে সুধারসে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য। যেখানে বিরহী হৃদয় চাতক পাখির ধেয়ান নিয়ে চেয়ে আছে আকাশে। বিছিয়ে দিয়েছে তার ব্যথিত হৃদয়। তমাল কুঞ্জপথে সজল ছায়াতে। নয়নে করুণ রাগ-রাগিণী জাগিয়ে। বকুল ফুলের মালা গেঁথে নিয়ে আগন্তুক বসে আছে। কখন মিলনের বাঁশি বাজবে তার জন্য। গীত বিতানে কখনও বর্ষা আসে নব সৌরভে নব হরষে।

কবিতাতেও বর্ষাকে করেছেন স্নিগ্ধ শ্যামল সুন্দর।

আষাঢ়, আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার, আজি শ্রাবণ ঘন গহন মোহে, মেঘের পরে মেঘ জমেছে, বর্ষার দিনে এই কবিতাগুলো পাঠ করলে বৃষ্টি বর্ষার চমৎকার ছবি মনে ভেসে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথকে কোন সীমার বন্ধনে প্রকাশ করার প্রয়াস ঝিনুক দিয়ে সাগর সিঞ্চনের মত। বাঙালির মনন ও সৃজনে রবীন্দ্রনাথ সন্ধ্যার প্রদীপের মত।

তার লেখনীতে যেমন বাংলা, বাঙালি, বাঙালি সংস্কৃতি, বাংলার রূপ ফুটে উঠেছে সেরকম তিনি ভারতবর্ষ তথা বাংলায় সমাজ সংস্করণেও ভূমিকা রেখেছিলেন। ঈশ্বর প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ কখনো সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে নিজেকে বদ্ধ করেননি। তৎকালীন জমিদারি প্রথার যে চিত্র সেখানে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ভিন্ন। জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও জমিদারি দেখাশোনার সময় তিনি প্রজাদরদী স্নেহ পরায়ন ছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় তিনি এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে কবিগুরুর কয়েকটি গান স্বদেশ পর্বে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে ভারত এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতাও তিনি।

নিজের জীবনের শিক্ষা গ্রহণ মাধ্যমের অভিজ্ঞতা থেকে শান্তিনিকেতনে আদর্শ শিক্ষা প্রদান এবং বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার জন্য তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা পরবর্তীতে বিশ্বভারতীতে রূপ নেয়।

এখন পর্যন্ত শুদ্ধ বাঙালি চর্চা বিশ্বভারতীতে দেখা যায়। বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক এবং শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডক্টর বিশ্বজিৎ ঘোষ তার এক বক্তব্যে বলেছিলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে এক জীবনে বুঝে ওঠা কঠিন। সত্যিকার অর্থেই তাই। বাংলার পরতে পরতে বাঙালির মনে মনে তিনি মিশে আছেন নিবিড়ভাবে।

বাংলা সাহিত্য যেমন তাঁকে ছাড়া চিন্তা করা অসম্ভব ঠিক সেরকম বাংলা ভাষা,বাংলা সংস্কৃতি,বাংলার রূপ-রস-গন্ধ রবীন্দ্রনাথের লেখা না পড়লে বুঝে ওঠা কঠিন। তার সাহিত্যকর্ম, সঙ্গীত, জীবন দর্শন এবং ভাবনা সত্যিকারের বাঙালি হতে অনুপ্রাণিত করে।

যেমন অনুপ্রাণিত করেছিল ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তার গান গুলো।

রবীন্দ্রনাথ একবার ভাবনায় পড়েছিলেন তার শেষ প্রস্থানের পর তাকে আর মনে রাখবে কিনা বাঙালি অথবা বাংলা। তিনি লিখেছিলেন,

"তবু মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে।

যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে।

যদি থাকি কাছাকাছি,

দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি--

তবু মনে রেখো।

যদি জল আসে আঁখিপাতে,

এক দিন যদি খেলা থেমে যায় মধুরাতে,

তবু মনে রেখো।

এক দিন যদি বাধা পড়ে কাজে শারদ প্রাতে-- মনে রেখো।

যদি পড়িয়া মনে

ছলোছলো জল নাই দেখা দেয় নয়নকোণে--

তবু মনে রেখো।"


কিন্তু তাঁর ১৫৯ তম জন্ম শতবার্ষিকীতেও ভক্তি ভরে শ্রদ্ধাভরে তাকে স্মরণ করছে বাংলা এবং বাঙালি।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাংলা কল্পনাতীত।

তার জন্মবার্ষিকীতে তাঁর ভক্তিভরে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।


লিখেছে, 

ওমর ফারুক

শিক্ষার্থী, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য লিখুন :