মধুমাসে পাকা আমের ঘ্রাণে লেগেছে লকডাউন

করোনাকালে নীরবে-নিভৃতে কেটে গেল কয়েকটি মাস। প্রকৃতির আত্মচিৎকার সোনেনি কেউ। নিরবে কেঁদেছে গাছ, আলো-বাতাস প্রাণী। এই বুভুক্ষ পৃথিবীতে মানুষ ছুটে চলেছে উল্টো পথে। লকডাউনে গৃহবন্দী মানুষের আড়ালে হাজার বছরের দীর্ঘনিঃশ্বাস থেকে মুক্তি পেয়েছে প্রকৃতি। গাছে গাছে ফুটেছে ফুল, বসন্তের ফাগুন হাওয়ায় গর্ভবতী হয়েছে প্রকৃতি। পাখিরা ছুটে চলেছে অবিরাম মুক্ত আকাশে পাখা মেলে। পিঁপিঁলিকার ক্রন্দন নেই আর এখন আগের মতন। বন্দুকের ভয় না থাকায় উড়ন্ত বগের ঠোঁটে খড়কুটু নিয়ে বাসা বাঁধতে দেখা যায় গাছের ডালে। দেখে মনে হয় কোন বাধা ছাড়ায় সংসার পেতেছে প্রকৃতি। মানুষ হয়েছে আজ গৃহবন্দী।

অজ মুকুলের ভারে আম গাছ হয়েছে গর্ভবতী নারী। অতঃপর করোনার আড়ালে প্রকৃতির মাঝে বেড়ে ওঠা গুটি শুটি আমগুলো কখন যে রসবতী হয়ে গেল হোমকোয়ারেন্টাইনে বন্দিজীবন বুঝতেই পারেনি ঢের। এই ষড়ঋতুর দেশে এমনটি হবার কথা ছিল না। তাইতো শতবর্ষী বৃদ্ধার চোখে আগে কখনো লকডাউন দেখেছেন এমনটি মনে পড়ে না।

পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের ভাষায়- ’’আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ি যাই/ ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ/ পাকা জামের মধু রসে রঙ্গিন করি মুখ’’। কবির এই উপলদ্ধি থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেছে। তাই, মানুষ হয়েছে আজ প্রকৃতি বিমুখ।

করোনাকালে শস্যক্ষেত নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলায় গ্রামের মেঠোপথ আর অলিগলিতে তাকালেই চোখে পড়বে শত শত বিঘা জমিতে গড়ে উঠেছে নাম না জানা হরেক রকমের আমের বাগান। বৈশাখের ঝড়ো হাওয়ায় খানিকটা আম ঝরে পড়লেও এখনো গাছের ডালে ডালে সবুজ পাতার আড়ালে উঁকি মারে নানান রঙের আম। আমের মৌ মৌ গন্ধে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন দেখছেন আম চাষিরা। অন্যদিকে করোনার লকডাউনে হোমকোয়ারেন্টাইনে থমকে যাওয়া মানুষের জীবনের সাথে কাক্সিক্ষত আমের মুল্য না পাওয়ার শঙ্কা নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটছে আমবাগানীদের।

জ্যৈষ্ঠ মাসে ষড়ঋতুতে প্রকৃতির চাকা ঘুরতে ঘুরতে গাছের ডালের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি মারে টস টসে রসালো আম। নাক ফজলি, ন্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি, বারোমাসি, আ পালি ইত্যাদি আমের ভারে নুয়ে পড়েছে গাছ। কথায় আছে চৈত্রের- "মধুমাসে প্রথমদিনে হয় যেই বার/ রবি শেষে মঙ্গল বর্ষে/ দুর্ভিক্ষ বুধবার/ সোম শুক্র শুরু আর/ পৃথিবী সয়না শস্যের ভার/ পাঁচ শনি পায় মীনে/ শকুনি মাংস না খায় ঘুনে/।"

তবে লোকমুখে পঞ্জিকার পাতাই গ্রীস্মের পরেই আসে জ্যৈষ্ঠ। এ মাসেই নাকি ফল পেকে রসের ভারে হয় টইটুম্বুর। সদ্য পেড়ে আনা গাছপাকা আমের ঘ্রাণে জিহ্বাতে অসাধারণ এক অনুভূতির জন্ম দেয়। আসুন আমরা সবাই এ মধু মাসে তাজা ফলের স্বাদ নিতে নিতে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাই। 

মন্তব্য লিখুন :