রাজনৈতিক সংস্কৃতি সুস্থ উপায়ে গড়ে উঠছে না

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশ, অর্থনীতি ও সমাজের পরিবর্তন ঘটে। অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন একটি দেশের জন্য দরকার। কিন্তু রাজনৈতিক দলেরও গুনগত মান বজায় রাখতে হবে। দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য বক্তব্য দিতে হবে। দলের কর্মীদের কাছে সময়োপযোগী নির্দেশ দিতে হবে।

দলের সদস্য সংখ্যার তালিকা বড় না করে প্রকৃত দেশ প্রেমিকদের রাজনীতিতে আনতে হবে। বিপথগামী অপ-রাজনীতির প্রেতাত্মা আমাদের উপর এখনও ভর করে আছে।

রাজনীতিতে সংস্কৃতির ধারণাটি যুক্ত হয়েছে লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা এবং মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা। মার্কসবাদের সঙ্গে সংস্কৃতির মার্কসীয় ধারণাও ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সব রাষ্ট্রে। রুশবিপ্লব (১৯১৭) ও চীনবিপ্লবের (১৯৪৯) পরে সংস্কৃতির ধারণা পাশ্চাত্য রাষ্ট্রসমূহের রাজনীতিকেও প্রভাবিত করেছে। মার্কস-এঙ্গেলস ইউরোপীয় ঐতিহ্য থেকেই সংস্কৃতির ধারণাটি লাভ করেছিলেন এবং নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী রূপ দিয়ে তাকে বিকশিত করেছিলেন।

সংস্কৃতি মানবীয় ব্যাপার, মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীরই সংস্কৃতি নেই। মানুষ কেবল বেঁচে থেকেই সন্তুষ্ট থাকে না, উন্নতি করতে চেষ্টা করে। বেঁচে থাকার ও উন্নতি করার জন্য মানুষকে চিন্তা ও কাজ করতে হয়। সংস্কৃতি হল মানুষের চিন্তার ও কাজের পরিশ্রুতিমান, উত্কর্ষমান, সৌন্দর্যমান, উত্তরণশীল, প্রগতিশীল, পূর্ণতাপ্রয়াসী পদ্ধতি। জীবনযাত্রার ও শিক্ষার মধ্যদিয়ে মানুষের নিজেকে এবং নিজের পরিবেশকে সুন্দর, সমৃদ্ধ ও উন্নত করার যে প্রবণতা চিন্তা ও চেষ্টা, তারই মধ্যে নিহিত থাকে তার সংস্কৃতি।

সংস্কৃতি যেমন ব্যক্তিগত জীবনের ব্যাপার, তেমনি যৌথ বা সমষ্টিগত জীবনেরও ব্যাপার। প্রগতিশীল জাতি ও রাষ্ট্রগঠনের সাধনা ও সংগ্রামের, সেইসঙ্গে দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক ও শিল্পকলা সৃষ্টির মধ্যদিয়ে মানুষ তার সাংস্কৃতিক সামর্থ্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। সংস্কৃতি ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক- সকল পর্যায়েরই ব্যাপার। জীবনযাত্রার এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত কাজকর্মের মধ্যদিয়ে মানুষের সুন্দর হওয়ার ও সুন্দর করার, সমৃদ্ধ হওয়ার ও সমৃদ্ধ করার এবং উন্নত হওয়ার ও উন্নত করার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও চেষ্টার মধ্যেই থাকে সংস্কৃতি। সংস্কৃতির মধ্যদিয়ে ব্যক্তির ও সমষ্টির কর্মেন্দ্রিয়, জ্ঞানেন্দ্রিয়, অন্তরিন্দ্রিয় ও পরিবেশের সংস্কার, রূপান্তর ও নবজন্ম ঘটে।

বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল যদি আন্তরিকতার সঙ্গে অপ-সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে, সংস্কৃতি বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার কর্মসূচি অবলম্বন করে, সকল কাজের মর্মে সংস্কৃতিকে স্থান দেয়, তাহলে তার প্রভাবে ক্রমে সব দলের রাজনীতিতেই সংস্কৃতি স্থান পাবে এবং তাতে সাধারণভাবে জাতীয় রাজনীতির মান উন্নত হবে। অপশক্তির কর্তৃত্ব টিকবে না।

যদিও সুষ্ঠু রাজনীতি চর্চায় দেউলিয়াত্ব যতই বাড়তে থাকে, জাতির অমর ব্যক্তিদের নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ির খেলা ততই প্রকট হয়ে ওঠে। বংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এ খেলা এতটা নিকৃষ্ট পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা রাজনীতিতে লজ্জাকর ও হাস্যকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে।

কোনো সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভাবমূর্তি নিয়ে এ ধরনের ছেলেমানুষি খেলা টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশে তা টিকে থাকছে এবং ক্রমশ প্রসার লাভ করছে বলে বোঝা যায়। এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সুষ্ঠু ও সুস্থ উপায়ে গড়ে উঠছে না।

বড় দলগুলোর পরস্পরবিরোধী প্রপাগান্ডাগুলো জনগণের একটি বড় অংশ, যারা রাজনৈতিকভাবে অসচেতন, অনভিজ্ঞ কিংবা স্বল্পশিক্ষিত, তারা ‘খাচ্ছে’। তারা ‘খাচ্ছে’ বলেই এসব নোংরা কাদা ছোড়াছুড়ির সংস্কৃতি টিকে থাকছে এবং দিন দিন বেড়েই চলেছে।

জনগণের এ বড় অংশটি যদি পরস্পরবিরোধী মিথ্যাচারগুলোকে গ্রহণ না করত, সেগুলোর দ্বারা প্রভাবিত না হতো, তবে তার ডেলিভারিও বিনা বাক্য ব্যয়ে বন্ধ হয়ে যেত। রাজনৈতিক আক্রোশবশত আক্রমণাত্মক বক্তব্যের প্রচলন থাকলেও তাতে মিথ্যাচার থাকত না।

সুতরাং এ অপসংস্কৃতি টিকে থাকার নেপথ্যে সর্বসাধারণের অজ্ঞতার বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। জাতির কোনো বিশেষ ব্যক্তির অবদানকে অতিরঞ্জিত করে অপর কোনো বিশেষ ব্যক্তির অবদানকে কাটছাঁটের মাধ্যমে দলীয় স্বার্থসিদ্ধির যতই ফন্দি-ফিকির করা হোক না কেন, সুশিক্ষায় শিক্ষিত তথা প্রকৃত ইতিহাস জানা নাগরিক এতে বিভ্রান্ত হবে না। বরং ওই নেতা বা নেতাদের বক্তব্য তার কাছে হাস্যাস্পদ মনে হবে।

আমাদের রাজনীতিতে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির তুলনাকরণের প্রবণতা বড্ড বেশি। এ ওর চেয়ে বড়, সে তার চেয়ে ছোট ইত্যাদি। এ ধরনের তুলনাকরণের মানসিকতা আধাসভ্য সমাজে চলতে পারে। বরণীয় ও স্মরণীয় ব্যক্তিদের প্রত্যেকের অবদানকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করে ইতিহাসের মানদণ্ডে তাদের নিজ নিজ স্থানে অধিষ্ঠিত করা হবে- সত্যিকার সভ্য সমাজের এটাই দাবি।

দেশের দৃশ্যমান উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। এ সাফল্য আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, জনকল্যাণমূলক প্রশাসন আর গণতন্ত্রের সুপ্রতিষ্ঠার ঘোষনা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। কলুষমুক্ত দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে বহুদূর।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে অনেক ইতিবাচক দিক যুক্ত হয়েছে। প্রশাসনিক অদক্ষতা আর দুর্নীতিকে লুকোনো যাচ্ছে না এখন। মানুষের যাপিত জীবনে স্বস্থি ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে এ দেশের আশাবাদী মানুষ প্রত্যাশার দীপ জ্বালিয়ে রাখতে চায়।

আওয়ামী লীগ সঠিক দিকনির্দেশনায় এগিয়ে যাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্নাত জাতি। অনান্য রাজনৈতিক দলের কাছেও মানুষ চায় শান্তি ও উন্নয়নের রাজনীতি। বিগত দিন থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে আরো এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা সকলের।


লেখকঃ

মোহাম্মদ হাসান,

সংবাদ কর্মী, কলামিস্ট

পিএ, সাবেক গণপূর্ত মন্ত্রী।

মন্তব্য লিখুন :