বর্তমান তরুণ প্রজন্ম একপ্রকার মূর্তিমান দানব

তারুণ্য এক প্রত্যয়, চেতনার উৎস, অনুপ্রেরণার অজেয় শক্তি। যারা নিজ প্রতিভায়, উদ্যমে, কর্মযজ্ঞে বদলে দেয় পৃথিবী তারাই তো চিরনবীন। তাদের নিয়েই তো নজরুল-সুকান্ত রচনা করেছেন দ্রোহের-বিপ্লবের হাজারো গান-কবিতা, যা মর্মে মর্মে জাগায় জয়ের প্রতিধ্বনি।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছর। আগামী ১৫ বছর পর তারাই রাষ্ট্রের ও সমাজের সবক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের মেধা ও প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে না দিলে তারা যে শুধু অযোগ্য নাগরিক হবেন তা নয়, তাদের একটি অংশ বিপথগামী হতে পারে।

বর্তমান তরুণ প্রজন্ম মানে একপ্রকার মূর্তিমান দানব। হাতে মারনাস্ত্র, ক্ষুর, চাপাতি, হকিস্টিক, লোহার রড, লাঠি, এমন কোন বেআইনী অস্ত্র নেই যা তারা বহন করেনা। 

সর্বনাশা ইয়াবা হিরোইন, পেথেড্রিন, ফেনসিডিল, মদ, ধূমপান ইত্যাদীতে আসক্ত হয়ে দানবীয় রুপ ধারণ করেছে। অপরদিকে বড় ভাই কেন্দ্রিক তরুণ প্রজন্মের রাজনীতি চর্চার বিকাশ তরুণদেরকে মহাদানবীয় শক্তিতে রুপান্তর করেছে। তাদেরকে দেখে মনে হয় এই মাত্র হামলা করে কারও না কারও জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিবে।

যার ফলশ্রুতিতে মূহুর্তেই এ তরুণ প্রজন্মের কাছে দাঙ্গা হাঙ্গামা লাগানো, প্রতিপক্ষকে হত্যা করা , কিংবা ভাড়াটিয়া হিসেবে হত্যাকান্ড সংঘটিত করা সবচেয়ে সহজ কাজে পরিণত হয়েছে। মানবিক চিন্তা ও মানবিকতা তরুণ প্রজন্ম থেকে বিদায় নিয়েছে। মাদকাসক্ত এ তরুণ প্রজন্ম তাদের নেশার পণ্য যোগাড় করতে এমন কোন কাজ নেই তারা করছেনা। সে ক্ষেত্রে তারা তাদের মানবীয় রুপকে বিসর্জন দিয়ে দানবীয় রুপকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ফলে তারা ছিনতাই,অপহরণ, ও ভাড়টিয়া হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। সে পেশায় নিজেকে একজন পরিণত ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতে সুশীল পোষাক পরিচ্ছদের বিপরীতে অশালীন ও অরুচিকর পোষাক, চুলের ডিজাইন করছে যা যেকোন সভ্য সমাজের ভাবনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তার অরুচিকর বৈশিষ্ঠ্য বাস্তবায়নের আগেই তার বাহ্যিক রুপ বলে দেয় সে কত ভয়ংকর। এমনি ভয়ংকর রুপে রাস্তার ধারে দাড়িয়ে মহিলাদের উত্যক্ত করা, মোবাইল টান দেওয়া ,ছিনতাই, জনসংকীর্ণ এলাকায় নারী নির্যাতন, কোচিং সেন্টারে জোরপূর্বক নারী নিপীড়ন ইত্যাদী সাবলীল ও ভয়হীন ভাবে করে যাচ্ছে।

ফলে ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে মানবতা বোধের বিলুপ্তি ঘটছে এবং বিকৃত মানবিক গুণাবলীর চর্চার প্রতি ধাবিত হচ্ছে। মোবাইলের অপব্যবহার করে ফেইসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ইমু, হোয়াটস এ্যাপস ইত্যাদী ব্যবহার করে তারা ভয়ংকর গ্রুপে সংঘটিত হচ্ছে। অপরিণত বয়সে স্কুল কলেজ ও মা বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে হোটেল, চাইনিজ রেস্তোরা, পার্ক কিংবা সাইবার ক্যাফে পর্ণো সংস্কৃতির প্রতি ঝুঁকে পড়ার পাশাপাশি অপ্রীতিকর অবাধ মেলামেশার প্রতি ধাবিত হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে চট্টগ্রামে বহুল আলোচিত আদনান তাশফিয়া ঘটনার পাশাপাশি রমজান ও গত ঈদুল ফিতরের বন্ধে বেশ কিছু হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে।

তরুণ প্রজন্মের কাছে নীতি, নৈতিকতা, আদব, শিষ্ঠাচার,ও লাজ লজ্জা পরিহারের যে হিড়িক পড়েছে তা ভবিষ্যতে মহামারি আকার ধারন করলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তা পূণরায় পরিষোধন করতে পারবে কিনা ভেবে দেখা দরকার। যে তরুণ প্রজন্ম পরিবার, সমাজ ,ও দেশের জন্য সম্পদে পরিণত হওয়ার কথা,সততার সাথে পবিত্র জীবন যাপনের মাধ্যমে নীতি নৈতিকতাকে পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করার কথা ,ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিয় উন্নতি কল্পে যেখানে তরুণের মেধাকে ব্যবহারের কথা , নতুন নতুন আবিস্কারের মাধ্যমে নিজকে দেশের জন্য, দেশকে বিশ্বের জন্য অপরিহার্য সম্পদে পরিণত করার কথা, সেখানে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম সম্পূর্ণ তার বিপরীত কর্মকান্ডে লিপ্ত হচ্ছে।

আমাদের পারিবারিক, সামাজিক জীবন ক্রমাগত অস্থির হয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে সামাজিক পরিবেশের অবক্ষয় হচ্ছে, আমরা সজ্ঞানে বা না জেনে এই পরিবেশ ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করছি। তরুণ-কিশোরদের বিপথগামী হওয়ার পিছনে এটাও একটি অন্যতম কারণ।

একটি শিশুর বিকাশের প্রধান পীঠস্থান হচ্ছে তার পরিবার। পরিবারে মা-বাবা যদি শিশুর বিকাশ সম্পর্কে আবেগ, মন ও ধারণাগতভাবে অপরিপক্ক থাকে তাহলে সেই পরিবারে শিশুর বিপথগামিতার সম্ভাবনা অধিকতর। এছাড়া বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের অসদাচারণ, মিথ্যাচার, দুর্নীতিপরায়ণতা, ভারসাম্যহীন ব্যবহার শিশুকে বিপথগামী করে তোলে। প্রতিবেশি ও আত্মীয়স্বজন দ্বারা শিশুরা দারুণ প্রভাবিত হয়।

এই সমস্যা দূর করতে হলে সামগ্রিক রাজনীতি নিয়েও ভাবতে হবে। দেশের সব তরুণ বিভ্রান্ত নয়, কতিপয় তরুণ আজ বিভ্রান্তির দিকে পা বাড়িয়েছে। কারণ তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে হতাশ। নীতিহীন শিক্ষা, আদর্শহীন রাজনীতি তাদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। যারা বিভ্রান্ত হচ্ছে তারা জানে না কেন তারা এই ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। বিপথগামী তরুণদের উগ্রপন্থা থেকে যে কোন মূল্যে আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। 

তরুণ, কিশোরদের আমরা কিভাবে বিপথগামিতা থেকে ফিরাবো? ব্যক্তিজীবন থেকে রাষ্ট্রজীবন পর্যন্ত সদাচারী হতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। সব পর্যায়ে শিক্ষা হবে আনন্দময় ও প্রকৃতিসম্মত। শিশুদের জন্য আনন্দের বিনোদনের পর্যাপ্ত আয়োজন রাখতে হবে। খেলার পর্যাপ্ত মাঠ, পার্ক রাখতে হবে। প্রকৃতির বিন্যাসের সাথে সামঞ্জস্য জীবনধারা গড়ে তুলতে হবে। যেসব কারণে শিশুদের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও ক্রোধ তৈরি হয় সে কারণগুলো যথাসাধ্য দূর করতে প্রয়াসী হতে হবে। সর্বোপরি শিশু-কিশোর তরুণদের সামনে মানব কল্যাণের স্বপ্ন তুলে ধরে সেই পথে তাকে নিরন্তর ডেকে যেতে হবে। তাহলেই আমাদের কিশোর তরুণেরা বিপথগামী হবে না।

তারুণ্যের অদম্য শক্তি-সাহসের কাছে যেকোনো কিছু ধরা দিতে এবং অপশক্তি পরাজয় মানতে বাধ্য। একটি দেশ এগিয়ে যায় তারুণ্যের শক্তিতে। যেদেশ তারুণ্যের শক্তিকে যতটুকু কাজে লাগাতে পেরেছে ততটুকু উন্নতির হিমাদ্রি শিখরে পৌঁছেছে। একটি দেশের তরুণদের যদি যথার্থ ব্যবহার যথা—নৈতিক শিক্ষায় বলিয়ান, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, গবেষণায় নিয়োগ, উদ্যোক্তা হতে উদ্বুদ্ধসহ নানাবিধ ভালো কাজে আনয়ন ও পরামর্শদান করা যায় তাহলে খুব সহজেই উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।

নচেৎ দেশের তারুণ্য শক্তি যদি নানা খারাপ কাজ যথা—অবৈধ মেলামেশা, পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত, ইভটিজিংসহ নানা খারাপ কাজে লিপ্ত থাকে এবং যথাযথ নৈতিক শিক্ষা প্রদান এবং দেশপ্রেমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা না যায় তখন দেশের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে এই তারুণ্যের শক্তি।

তারুণ্য শক্তি, তারুণ্য বল, তারুণ্যের হাত ধরে এগিয়ে চলবে সোনার বাংলাদেশ। তাই তারুণ্যের শক্তির যথাযথ প্রয়োগে আমাদের মনোনিবেশ করা খুবই প্রয়োজন। তরুণদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাই রাষ্ট্রের সুনজর একান্ত কাম্য। সুস্থ সবল, সত্ নিরপেক্ষ, নির্ভীক, গণতান্ত্রিক, স্বপ্নচারী তারুণ্যের জয় হোক। 


লেখক

মোহাম্মদ হাসান

সাংবাদিক, কলামিস্ট

পিএ, সাবেক গণপূর্ত মন্ত্রী

মন্তব্য লিখুন :