করোনা, কবি নজরুল ও দুর্ভিক্ষ: আমরা কতটুকু হুঁশিয়ার!!

১.সত্তরের দশক’কে ধরা হয় বিশ্বায়নের সোনালী যুগ। এই দশকে একটি দেশের সাথে অন্য আরেকটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, পুঁজিপ্রবাহের অবাধ বিকাশ এবং বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করার জন্য ‘গ্লোবালাইজেশন’ বা বিশ্বায়ন শব্দটির বহুল ব্যবহার শুরু হয়। বিশ্বায়নের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে কানাডিয়ান গণমাধ্যম তাত্ত্বিক মার্শাল ম্যাকলুহান ১৯৬২ সালে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রাম তত্ত্বের প্রবর্তন করেন। মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘বিশ্বগ্রাম’ তত্ত্বটির মূল কথা হলো- সারা বিশ্ব একটি গ্রামের সমরুপ। একটি গ্রামে যেমন সবার সাথে সবার যোগাযোগ স্থাপন করা, খোঁজ-খবর রাখা সহজ, ঠিক তেমনি বিশ্বগ্রামের অন্তভূর্ক্ত প্রত্যেকটি রাষ্ট্র একে অপরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা সহজ, ‘বিশ্বগ্রাম’ এর অধিবাসীরা একে অপরের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থানান্তর, সংস্কৃতি সকল দিক দিয়ে নিমেষেই যুক্ত হতে পারে। মূলত: মার্শাল ম্যাকলুহানের তত্ত্বটি বিশ্লেষণ করেই পরবর্তিতে মানুষ ‘বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়’ ধারণার বিস্তৃতি ঘটায়। কিন্তু বর্তমানে করোনা কালীন সময়ে ম্যাকলুহানের তত্ত্বটি শুধু হুমকীর মুখেই  পরেনি, ভেঙ্গেও পড়েছে। সম্প্রতি,  পরিস্থিতি এমন হয়ে দাড়িয়েছে যে, একটি রাষ্ট্রের সাথে অন্য রাষ্ট্র যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। তবে অনেক তাত্ত্বিক এটাও বলছেন এই দুর্যোগ সাময়িক, মার্শাল ম্যাকলুহানের তত্ত্বটি চিরঞ্জীব। প্রশ্ন থেকে যায়, যে তত্ত্ব নিয়ে বিশ্বব্যাপী এতো আলোচনা এতো বিশ্লেষণ, এতো হৈচৈ, সেই তত্ত্বটিও করোনা ভাইরাসের কাছে নাজুক ও দুর্বল। অর্থাৎ প্রকৃতি ও সৃষ্টার কাছে মানুষের তত্ত্ব অত্যন্ত নগন্য মূল্যহীন!

২. বাংলা ১৩৩৩ সালের ৬ই জ্যৈষ্ঠ কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এই কবিতায় কবি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার/ লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার! অর্থাৎ মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘বিশ্বগ্রাম’ তত্ত্বটি এই জামানায় যেখানে হাবুডুবু খাচ্ছে, সেখানে কবি নজরুলের কবিতা সতর্কবানী শুনিয়ে আরো উজ্জল থেকে দ্বীপ্তিমান হচ্ছে, কি মহা বিস্ময়! কবিতাটি লেখা প্রায় একশত বছর পূর্বে কিন্তু সমকালীন তা কতখানি প্রাসঙ্গিক পাঠক মাত্রই বুঝতে সক্ষম। বাঙালীজাতিকে এমনকি সারা বিশ্ববাসীকে মহা দুর্যোগ সর্ম্পকে কবি নজরুল তাঁর কবিতার মাধ্যমে শত বছর পূর্ব থেকে অদ্যাবধি সতর্ক করে আসছেন। কবি নজরুল সাম্যবাদের কবি, প্রেম ও দ্রোহের  কবি, সর্বোপরি বাঙালী জাতির প্রাণের কবি। তিনি শুধু একজন কবিই নন, তিনি সমাজবিশ্লেষক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, দার্শনিক ও প্রখর দেশপ্রেমিক। কালের বিবর্তনে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়, সমাজ থেকে হারিয়ে যায় অনেক নামী-দামী বিষয়বস্তু কিন্তু হারিয়ে যায় না, আমাদের প্রাণ-প্রিয় কবির লেখা কবিতা, গান, শিল্প-সাহিত্যে। দিন যায় কবির লেখা আরো প্রাসঙ্গিক হয়। কবি আমাদের মহা দুর্যোগ থেকে সতর্ক করে, হুঁশিয়ার হওয়ার জন্য লিখে যান তাঁর অমীয় বানী। কবির ভাষায়, দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,/ ছিঁড়িযাছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?/ কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ। এ তুফান ভারি, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার//  কবির কবিতা পাঠ করলে মনে হতে পারে, কবি বুঝি বর্তমানের করোনা ভাইরাস নিয়েই কথা বলছেন, মনে হয় তিনি বলছেন, পৃথিবীর কোন শক্তিধর রাষ্ট্র কিংবা ব্যক্তি তাদের হিম্মৎ দিয়েও এটার মোকাবেলা করতে পারবেনা। তিনি হয়তো তাঁর কবিতা দিয়েই বোঝাতে চেয়েছেন এ দুর্যোগ মহা দুর্যোগ, এই দুর্যোগ পাড়ি দিতে হলে যুবাদের বেশি অগ্রসর হতে হবে, সমাজের মানুষকে সতর্ক হতে হবে, হুঁশিয়ার হতে হবে। যে করেই হোক এই তুফান পাড়ি দিয়ে এই দেশকে, এই সমাজকে, এই জাতিকে রক্ষা করার জন্য কবি আমাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।  জাতীয় কবির আহ্বানে কতজন সাড়া দিয়েছেন বা দিবেন তা হয়তো কারোই জানে নেই, তবে কবির আহ্বানে সাড়া না দিয়েও আমাদের বেঁচে থাকার পথ আছে কী? প্রশ্ন থেকেই যায়।

৩. মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০ শে এপ্রিল ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তভূর্ক্ত জেলাসমূহের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনায় বলেন, করোনা ভাইরাসের জন্য সারা বিশ্বব্যাপী যে খাদ্য মন্দা সৃষ্টি হবে তাতে আগামীতে বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু বাংলাদেশে আমরা যদি খাদ্য উৎপাদন করে খাদ্য মজুত রাখতে পারি তাহলে আমরা দুর্ভিক্ষে পড়বনা (সুত্র- ইউএনবি সংবাদ, ২০ শে এপ্রিল)। দুর্ভিক্ষের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারন।

১৭৭০ সালে বাংলা ১১৭৬ সালে যে  দুর্ভিক্ষ হয়েছিলো তার অন্যতম কারন ছিলো অতিবৃষ্টি ও বন্যা যা ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে অধিক পরিচিত। বন্যার পাশাপাশি এই দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী ছিলো দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা, ত্রুুটিপূর্ণ ভূমিরাজস্ব ও খাদ্য বাজারে দালাল ফড়িয়া শ্রেণীর অতিরুক্ত দৌরাত্ম, এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ১ কোটি মানুষ মারা যায় (সুত্র- উইকিপিডিয়া এবং বাংলাপিডিয়া)। ১৯৪৩ বা বাংলা ১৩৫০ সালের দুর্ভিক্ষটি ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, খাদ্য শস্যের উৎপাদন হ্রাস, দালালদের দৌরাত্মর পাশাপাশি তৎকালীন সরকারের অব্যবস্থাপনাও দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী ছিলো, এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করে (সুত্র-উইকিপিডিয়া)।  ১৯৭৪ সালে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষ ‘৭৪-এর দুর্ভিক্ষ’ নামে পরিচিত। খাদ্য সংকট, চাল ও লবণের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরেও কৃষি পন্যর উৎপাদন কম হওয়াতে এই দুর্ভিক্ষ দেখা গিয়েছিলো। সরকারি হিসেব মতে, এই দুর্ভিক্ষে ২৭,০০০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে (সুত্র-উইকিপিডিয়া)।

বর্তমানে করোনা ভাইরাসের কারণে যে সংকট তাতে ফসল উৎপাদন থেমে না গেলে দুর্ভিক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে, উপরের প্রত্যেকটি দুর্ভিক্ষ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রতিটি দুর্ভিক্ষেই দালালদের অতিরুক্ত দৌরাত্ম ছিলো। বর্তমান সময়ে অসাধু নেতাদের দৌরাত্ম, দালাল ও সিন্ডিকেটের পন্য মজুদ করা ও সরকারি পন্যদ্রব্য অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে গেলে দুর্ভিক্ষ না হলেও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি শুধু করোনা কালীন সময়ে নয়, করোনা পরিবর্তি সময়ে আরো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। মধ্যবিত্ত, নি¤œমধ্যবিত্ত এবং অতি সাধারণ মানুষ যদি খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতে পারে তাহলে করোনা কালীন কিংবা পরবর্তিতে তেমন কোন সমস্যা হবেনা। আর কোনভা্েব খাদ্যদ্রব্য যদি সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায় তাহলে করোনা কালীন কিংবা করোনা পরবর্তি কালীন সামাজিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। তাছাড়া সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার যে সব কারণ রয়েছে তার মধ্যে বেকারত্ব ও দরিদ্রতা অন্যতম। সরকারি হিসেব মতে, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৩ লাখ ৭৭ হাজার, পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ২৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯৮ জন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক সংখ্যা ৩১ লাখ ২৩ হাজার ৩৭০ জন ( সুত্র- দৈনিক যুগান্তর, ২০ জুন, ২০১৯)। বেসরকারি কিংবা পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে থেকে যদি করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ১০-১২ লাখ শ্রমিক বেকার হয় তাহলে সামাজিক সমস্যা ভিন্নদিকে মোড় নিতে পারে। এছাড়াও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের হিসেব মতে, দেশে দরিদ্রতার হার ২০.৫ এবং মোট জনসংখ্যা ১৬.১৭ কোটি, সেই হিসেবে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ। করোনা পরিস্থিতি আরো কয়েক মাস দীর্ঘ হলে এই বিপুল প্রান্তিক জনগোষ্টি এবং বেকার লোকদের খাদ্য সমস্যা এবং মৌলিক চাহিদা পূরণ না করা গেলে দেশে সামাজিক সমস্যা মারাত্মক আকারে দেখা দিতে পারে। চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাপি. রাহাজানি, ধর্ষণ, হানাহানি ও লুটপাট বেড়ে যেতে পারে, সেক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগনকে এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো,  অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, বেকারদের ভাতা প্রদান, গরীব-অসহায় লোকদের সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের একার পক্ষে এই বিপুল জনগোষ্টিতে দীর্ঘকালীন আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা প্রদান করা দুস্কর হতে পারে, এক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবানদের জনসেবামূলক কাজে এগিয়ে আসতে হবে, তাহলেই করোনার পাশাপাশি এদেশের সামাজিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সহজ হবে। তবে করোনা পরিস্থিতি স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদী যেটাই হোক কয়েকটি প্রশ্ন আমাদের মনে থেকেই যাবে-

১. মানুষের সাথে মানুষের সামাজিক সর্ম্পক কী আগের মতো থাকবে?

২. প্রিয় মানুষদের সাথে কী আমরা হাত মেলাতে পারবো?

৩.আত্বীয়তার বন্ধন কী আর মজবুত হবে?

৪. বেকারদের সংখ্যা বাড়বে না কমবে?  


 মো: রিয়াজুল ইসলাম  

শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।  


মন্তব্য লিখুন :