১২ বছর পথহারা কৃষক পরিবার

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার রাধাপুর গ্রামের শাহাবদ্দিন নামে এক কৃষকের পরিবার ১২ বছর আগে চলাচলের রাস্তা কেটে বন্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন।

অভিযুক্ত আওয়ামীলীগ নেতার নাম গোলাম মাওলা। তিনি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ৬ নম্বর বাঙ্গাখাঁ ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। রাস্তা না থাকায় মানবেতর চলাচল করতে হচ্ছে কৃষক শাহাবদ্দিনের পরিবারের। এক যুগ ধরে রাস্তা নেই, চলাচল করছে অন্যের বাড়ির আঙ্গিনা দিয়ে। কখনো বাড়ির ডোবা, আবার কখনো কখনো হাটু পানি দিয়ে চলতে হয়।

জানা গেছে, স্ত্রী, ৭ ছেলে ও ২ মেয়ে নিয়ে কৃষক শাহাব উদ্দিনের সংসার। যখন গোলাম মাওলা রাস্তা কেটে নিয়ে যায়, তখন প্রতিবাদ করার কোন সুযোগ ছিল না শাহাব উদ্দিনের। এখন ছেলেরা বড় হয়েছে, বুঝতে শিখেছে, এজন্য নিজেদের জমিতে রাস্তা নির্মাণে বাধা দেওয়ায় তারা প্রতিবাদে নেমেছেন। বাবাকে নিয়ে নিজেদের জমিতে রাস্তা নির্মাণে অনবরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ২০ বছর আগে রাধাপুর গ্রামে কৃষক শাহাব উদ্দিন নতুন বাড়ি নির্মাণ করে। তখন বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য অন্য সঙ্গে একই রাস্তা ব্যবহার করতেন। ২০১২ সালে ওই রাস্তা আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মাওলা নিজেদের দাবি করে মাটি কেটে নিয়ে যায়। এতে রাস্তাটিতে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অন্য পরিবারগুলোর বিকল্প রাস্তা থাকলেও শাহাব উদ্দিনদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার কোন পথ ছিল না। পরে সামনেই অন্য একটি বাড়ির ভেতর দিয়ে চলাফেরার সুযোগ করে নেয়, তাও পুকুর পাড়ের সরুপথ। কিন্তু সবসময় অন্যের বাড়ির ভেতর দিয়ে চলাফেরা করা সম্ভব? এজন্য ৩ বছর আগে স্থানীয় নুরুল আমিনের কাছ থেকে শাহাব উদ্দিন বাড়ির সামনে একটি ডোবার ১১ শতাংশ জমি (৯১৯ দাগ/দেবানন্দ রায়েরখিল মৌজা) ক্রয় করে। জমিটি বকশাল মিয়ার পোল থেকে মিত্রের সড়কের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। কিন্তু ৫ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে গোলাম মাওলা রাস্তা নির্মাণ করতে দিচ্ছে না। তিনি বিভিন্নভাবে শাহাব উদ্দিনের পরিবারকে হয়রানি করে আসছে।

স্থানীয় কৃষক তাজুল ইসলাম বলেন, প্রায় ১২ বছর ধরে শাহাব উদ্দিনদের বাড়ির রাস্তা নেই। একসময় আমরা একই রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করতাম। গোলাম মাওলা ওই রাস্তা নিজেদের দাবি করে মাটি কেটে নিয়ে যায়। পরে আমরা বাড়ির অন্য পাশ দিয়ে চলাফেরা করি। কিন্তু বিপাকে রয়েছে শাহাব উদ্দিনরা। এখন জমি কিনেও তারা রাস্তা করতে পারছে না। 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কৃষক শাহাব উদ্দিন বলেন, ৩ বছর আগে আমরা রাস্তার জন্য ১১ শতাংশ জমি কিনেছি। ৫ লাখ টাকার চাঁদার জন্য গোলাম মাওলা আমাদেরকে রাস্তা করতে দিচ্ছে না। আমরা একরকম গৃহবন্দি অবস্থায় আছি। ওই জমিতে শনিবার (২৯ মে) সবজি গাছ রোপণ করতে গেলে মাওলা এসে আমার স্ত্রীকে মারধর করে। আমাদের জমিতে রাস্তা নির্মাণে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। 

শাহাব উদ্দিনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম বলেন, গোলাম মাওলা আমাদের বাড়ির রাস্তা কেটে নিয়ে গেছে। বাড়ির চারপাশে বেড়া দিয়েও রেখেছে কয়েকবছর। অন্যের বাড়ির ভেতর দিয়ে অনেক কষ্টে চলাফেরা করি। একজন মেহমান আসলে তাকে বাড়িতে নেওয়ার মতো অবস্থা থাকে না। ছেলেদেরকে বিয়েও করাতেও পারছি না।  

অভিযোগ অস্বীকার করে বাঙ্গাখাঁ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, একই দাগে আমারও জমি আছে, তাদেরও আছে। রাস্তা করতে আমি তাদের বাধা দেয়নি। চাঁদা চাওয়ার অভিযোগটিও মিথ্যা। তারা জমি পেতে আদালতে অভিযোগ দিয়ে ১৪৪ ধারায় আমাকে নোটিশ করেছে। কিন্তু তারা ওই জমিতে কাজ করছিল। বাধা দিলে তারা আমার ওপর হামলা করে। বাঙ্গাখাঁ ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জহির বলেন, ঘটনাটি নিয়ে আদালতের মামলার তদন্তের নির্দেশ এসেছে। আমি তদন্ত করে প্রতিবেদন যথাসময়ে জমা দেবো। তবে শাহাব উদ্দিনের মালিকানা সঠিক। একই দাগে অন্য ব্যক্তিদেরও জমি আছে। এখন দখল নিয়েই সমস্যা হচ্ছে। 

জানতে চাইলে বাঙ্গাখাঁ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী আনোয়ার হোসেন কাজল বলেন, শাহাব উদ্দিনদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার রাস্তা না থাকার বিষয়টি জেনে আমি একবার ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। বিষয়টি সমাধানের জন্য দু’পক্ষকেই ডাকা হয়েছে, কিন্তু আসেনি।

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মাসুম বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের লিখিত অভিযোগ পেলে এসিল্যান্ডের মাধ্যমে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হবে। অভিযোগের সত্যতা মিললে রাস্তা নির্মাণের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।

মন্তব্য লিখুন :