ভোলার নদ-নদীতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ

প্রতিবছরের বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসের পুরো সময়টাই ইলিশের ভরপুর মৌসুম। কিন্তু সেই সময়ে এবার জেলেরা নদ-নদীতে পাচ্ছে না ইলিশ। ধারদেনা করে চলছে জেলে পরিবারগুলো। বাজারেও মিলছে না মানুষের কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। যাও বা পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই সাগরের। সেই ইলিশের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

সবার জানা কথা, সাগরের ইলিশের তুলনায় নদীর ইলিশের স্বাদ বেশি। সাগরের ইলিশের স্বাদ কিছুটা লবণাক্ত হয়ে থাকে, নদীতে এসে স্রোতের প্রতিকুলে সাঁতার কেটে ইলিশ উজানের দিকে চলে আসে বলে গায়ের লবণ ঝরে যায়, ফলে ইলিশের আকার ও স্বাদ দুটোই বাড়ে।

এ কারণে সাগরের চেয়ে নদীর ইলিশের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। তাই জনমনে প্রশ্ন- ‘সময় তো চলে যাচ্ছে, আর কবে দেখা মিলবে সেই কাঙ্ক্ষিত ইলিশের?’

ভোলার বিভিন্ন এলাকার জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদ-নদীতে পানি লবণাক্ত ও স্রোত প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাই সাগর থেকে ঝাঁক বেঁধে ইলিশ নদীর মোহনায় আসতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব, নদীর মধ্যে জেগে ওঠা নতুন চর এই কারণে নদীতে প্রয়োজনীয় স্রোত নেই। আর এ কারণেই বৃষ্টি থাকার পরেও এই ভরা মৌসুমে ইলিশের দেখা পাচ্ছেন না জেলেরা।

এদিকে, উপকূলীয় নদ-নদীতেও আর আগের মতো ইলিশ ধরা পড়ছে না। উত্তাল মেঘনা-তেঁতুলিয়া পাড়ি দিয়েও ইলিশসহ কোনও মাছেরই তেমন দেখা মিলছে না জেলেদের জালে। তবে জেলেদের দাবি, সাগরে প্রচুর ইলিশ রয়েছে।

ইলিশের স্বর্গরাজ্য বলে খ্যাত ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে প্রত্যাশিত ইলিশ মাছ নেই। তবে গত কয়েকদিন সাগরে কিছু ইলিশ ধরা পড়ছে বলে জানা গেছে।

বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসের ভরা মৌসুমে ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশায় থাকলেও জেলেদের সে আশা পুরণ হয়নি। তাই শ্রাবণের পূর্ণিমায় কিছু ইলিশ মাছ ধরা পড়বে বলে আশা করছেন জেলেরা। এখন তারা সেই আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন বলে এই প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন ভোলার চরফ্যাশনের সামরাজ ঘাটের ইলিশের আড়ৎদার দিদার মিয়া।

ভোলার বৃহত্তম মৎস্য ঘাট সামরাজের ইলিশ ব্যবসায়ী আড়ৎদার সমিতির কোষাধ্যক্ষ মোঃ করিম মিয়া জানিয়েছেন, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কিছু জেলে নদীতে সারা বছরই বিভিন্ন মাছের পোনা ধরে। এর মধ্যে ইলিশের পোনাও জালে ধরা পড়ে। এবং অবরোধের সময় ভারতীয় জেলেরা আমাদের সাগরে ডুকে ছোট,বড় ইলিশ মাছ ধরে নিয়ে যায়। এতে ইলিশের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়। ভরা মৌসুমে জেলেদের জালে ইলিশ মাছ কম ধরা পড়ার এসবও একটি কারণ বলে মনে করেন তিনি।

নিষিদ্ধ সময়ে ভোলার বিভিন্ন হাট-বাজারেও গত এপ্রিল-মে মাসে কাঁচকি মাছের সঙ্গে ইলিশের পোনা দেদারসে বিক্রি হতে দেখা গেছে এবছর। ফলে ব্যাপক হারে মাছের পোনা নিধনের ঘটনায় নদীতে ইলিশের পরিমাণ একেবারেই কম।

মেঘনা নদীর জেলে শাহে আলম মিয়া জানান, মাছের অবস্থা একে ভারেই খারাপ,নদ-নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। ধারদেনা করে কোন মতে চলছে সংসার।

ভরা মৌসুমে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা না পড়ায় ভোলায় ইলিশ মাছের আড়ৎগুলোয় এখন ব্যবসায়ীরা অলস সময় পার করছেন।

স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, প্রতিবছরের বৈশাখ,জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাস জুড়ে পুরোটাই ইলিশের ভরা মৌসুম। এই মৌসুমে জেলেরা দলে দলে জাল ও নৌকা নিয়ে নদীতে নামেন। অতীতের মতো এবছরও তারা জাল ও নৌকা নিয়ে নদীতে গেছেন। কিন্তু জালে ইলিশ মাছ ধরা পড়ছে না। এ কারণেই ইলিশের অভয়ারণ্য বলে পরিচিত ভোলার জেলে ও ইলিশ ব্যবসায়ীরা অনেকটা হতাশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইলিশ সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত পাইকারি বাজার ও ইলিশের মোকামগুলোয়।

বরিশালের পোর্ট রোডের ইলিশের পাইকারি ব্যবসায়ী মোঃ লিটন মিয়া বলেন, প্রতি বছরের ইলিশের এই মৌসুমে এই আড়তগুলোয় শ্রমিকরা ট্রলার থেকে ইলিশ মাছ ওঠানো নামানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করতো। কিন্তু এ বছরের চিত্র ভিন্ন। এ বছর প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ মিলছে না।

স্থানীয় একাধিক মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, উপকুলীয় নদ-নদীতে আর আগের মতো ইলিশ ধরা পড়ছে না। ফলে আড়তগুলো গত কয়েক মাস ইলিশ সরবরাহের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। সংকট দেখা দেওয়ায় আড়তদের অনেক শ্রমিক ইলিশ ওঠানো ও নামানোর কাজ ছেড়ে অন্য কাজ করছেন। আবার অনেকে বেকার হয়ে পড়েছেন।

এদিকে ভোলা সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ও জলবায়ু বিরূপ প্রভাবের কারণে উপকূলীয় নদ-নদীতে এখন আর আগের মতো মাছ ধরা পড়ছে না। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, সাগরে প্রচুর মাছ আছে। আশা করা যায় জুলাই মাসের শেষ দিকে নদ-নদীতেও জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়বে।

মন্তব্য লিখুন :