টিকা নিবন্ধনে টাকা আদায়, ৩ স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যাহার

সারাদেশে বিনামূল্যে টিকার নিবন্ধনের জন্য ইউপি চেয়ারম্যান ও পৌরসভার কাউন্সিলরদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে স্বাস্থ্য সহকারী কমিউনিটি ক্লিনিকে নিজেই দোকান খুলে বসেন। ছেলের কম্পিউটার এনে জনপ্রতি ৫০ টাকা করে নিয়ে টিকার নিবন্ধন করে দিয়েছেন।

এ ঘটনায় উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের গাজীনগর স্বাস্থ্য সহকারী সুনীল চন্দ্র দেবনাথসহ তিনজনকে কেন্দ্র থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। শনিবার (০৭ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে তাদের পরিবর্তে টিকাদান কেন্দ্রে নতুন তিনজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রত্যাহারকৃত অন্যরা হলেন- গাজীনগর কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) নুরজাহান বেগম ও স্থানীয় পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রের পরিবার কল্যাণ সহকারী চন্দনা রাণী নাথ।

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার, মঙ্গলবার ও বুধবার স্বাস্থ্য সহকারী সুনীল চন্দ্র দেবনাথ গাজীনগর কমিউনিটি ক্লিনিক ও রমজান আলী পাটওয়ারী বাড়ির ইপিআই টিকাকেন্দ্রে বসে স্থানীয়দের টিকার নিবন্ধন করেন। সেখানে তিনি জনপ্রতি ৫০ টাকা করে কম্পিউটার খরচ নেন। এর মধ্যে যারা টাকা দিতে পারেননি তাদের নিবন্ধন করা হয়নি। এতে তাকে ক্লিনিকের সিএইচসিপি নুরজাহান ও পরিবার কল্যাণ সহকারী চন্দনা রাণী নাথ সহযোগিতা করেন।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার তাদের বিরুদ্ধে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটিতে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও বাহারুল আলমকে প্রধান করে তিনদিনের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। তদন্তের বিষয়ে খোলাখুলি কিছু না বললেও শনিবার বেলা ১১টার দিকে অভিযুক্ত তিনজনকে কেন্দ্র থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তাদের পরিবর্তে নতুন তিনজনকে দায়িত্ব দেয় উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন আবদুল গফ্ফার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নিবন্ধনে টাকা আদায়ের ঘটনায় দুইজন স্বাস্থ্য সহকারীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাকি একজন পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের। কর্তৃপক্ষ তাকেও প্রত্যাহার করেছে। প্রত্যেকটি কেন্দ্রে বিনামূল্যে নিবন্ধন করানোর জন্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া ছিল। জেলার ১৯৫টি কেন্দ্রে ৩৯ হাজার মানুষকে টিকাদানের কথা রয়েছে। এর মধ্যে বৃষ্টি ও ওয়েবসাইটের ঝামেলার কারণে অনেকেই নিবন্ধন করতে পারেননি। প্রত্যেকটি কেন্দ্রেই ২০০ জনকে টিকা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

এদিকে শুক্রবার গভীর রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত লক্ষ্মীপুরে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে টিকা নিতে কেন্দ্রে এসে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে সবাইকে। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের লামচরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এনআইডি কার্ড নিয়ে গেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সিলর দুটি দোকান দেখিয়ে দেন। সেখানে গিয়েই টিকা নিবন্ধনের জন্য ও কার্ড ডাউনলোড করে প্রিন্টের জন্য ৪০-৫০ টাকা করে গুনতে হয়েছে সবাইকে। টাকা দিয়েও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে নিবন্ধন করতে আসা মানুষজনকে।

স্বাস্থ্য সহকারী সুনীল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, টিকা নিবন্ধনের কোনো দায়িত্ব আমার ছিল না। তবুও ছেলের কম্পিউটার এনে নিজ উদ্যোগে নিবন্ধন করে দিয়েছি। এর জন্য এনআইডি নম্বর খাতায় লিখে ৫০ টাকা করে কম্পিউটার খরচ নিয়েছি। গত কয়েকদিন অর্ধ-শতাধিক লোকের নিবন্ধন করে তাদেরকে টিকা কার্ড দিয়ে দিয়েছি। শনিবার প্রায় ৫৫ জন টাকা দিয়ে আমার কাছে নিবন্ধন করেছেন। এদের কার্ড আগামী ২-৩ দিনের মধ্যে ক্লিনিকে দিয়ে দেবেন বলে জানান তিনি।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) নুরজাহান বেগম বলেন, টাকা নিয়ে নিবন্ধনের ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত নই। আমি ক্লিনিকের ভেতরে বসে কাজ করি। বারান্দায় স্বাস্থ্য সহকারী কি করেছেন তা আমি জানি না। কারও কাছ থেকে কোনো টাকা আমি নিইনি।

অভিযুক্ত পরিবার কল্যাণ সহকারী চন্দনা রানী নাথ বলেন, স্বাস্থ্য সহকারী সুনীলের অনুরোধে ইপিআই কেন্দ্রে নিবন্ধনের জন্য আসা ব্যক্তিদের এনআইডি নম্বরগুলো আমি খাতায় লিখে দিয়েছি। তিনিই নিজ দায়িত্বে ৫০ টাকা করে নিয়েছেন। আমি টাকা ছুঁয়েও দেখিনি। টাকা নেওয়ার ব্যাপারে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. বাহারুল আলম বলেন, তিন স্বাস্থ্যকর্মী টিকার জন্য নিবন্ধনের নামে টাকা আদায় করে অন্যায় করেছেন। সিভিল সার্জনের নির্দেশে তাদেরকে কেন্দ্র থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আমাকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। তাদের পরিবর্তে শনিবার বেলা ১১টায় নতুন তিনজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি ঢাকায় আছি, রোববার (০৮ আগস্ট) এ বিষয়ে বিস্তারিত বলবো।

রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাকির হোসেন বলেন, রোববার অভিযোগের তদন্ত শেষ হবে। তখন প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিবন্ধনের দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদের ছিল। স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ব শুধু টিকা দেওয়া। যেহেতু ওই তিন কর্মীর বিরুদ্ধে নিবন্ধনের জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এজন্য তাদেরকে এ কার্যক্রম থেকে দূরে রাখতে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন :