পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্যে বছরে ৪ মাস আমদানি বন্ধ

দেশে পেঁয়াজের দাম উঠা-নামায় দুর্বিষহ করে তুলেছে জনগনকে। সরকার নানা পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও কমছে না পেঁয়াজের দাম। জরুরিভিত্তিতে কয়েকটি দেশ থেকে উড়োজাহাজে পেঁয়াজ আমদানি করা হলেও ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। দেশে সারা বছর পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ১৬ থেকে ১৭ মেট্রিক টন দেশে উৎপাদিত হয়। বাকি ৮ থেকে ৯ মেট্রিক টন আমদানি করা হয়। তবে কৃষকেরা পেঁয়াজের দাম পেলে বাকি ৮ থেকে ৯ মেট্রিক টন পেঁয়াজ বাড়তি উৎপাদন করা সম্ভব।

সাধারণত পেঁয়াজ হার্ভেস্টিং সময় (পেঁয়াজ উত্তোলনকালীন) কৃষকেরা দাম পান না। তাই পেঁয়াজ উত্তোলনকালীন চার মাস বিশেষ করে এপ্রিল, মে, জুন ও জুলাই মাসে সব ধরনের পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকবে। যাতে করে কৃষকরা পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পান এবং পেঁয়াজ চাষে উৎসাহী হন। চার মাস পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং দেশে পেঁয়াজের সংকট থাকবে না বলে মনে করে কৃষি মন্ত্রণালয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ও অর্থমন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি। চার মাস পেঁয়াজ বন্ধের বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেছেন। আগামী বছরেই এ বিষয়ে আইন পাস হবে। এবং নতুন বছরের এপ্রিল থেকে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে বলে নিশ্চিত করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানা যায়, কৃষক বাঁচাতেই পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এটা একটা বড় সিদ্ধান্ত।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ অনুবিভাগ) সনৎ কুমার সাহা বলেন, এ বছর পেঁয়াজ অনেক অস্থিরতা তৈরি করেছে। পেঁয়াজ নিয়ে নতুন করে সংকট চায় না। আমরা পেঁয়াজের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করবো। বর্তমানে পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ মেট্রিক টন। আমার বিশ্বাস কৃষক দাম পেলে ৩০ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন সম্ভব। তাই হার্ভেস্টিং সময়ে আর পেঁয়াজ আমদানি করা হবে না। বাণিজ্যমন্ত্রীকে এ বিষয়ে নীতিগত সমর্থন দিয়েছেন।

সনৎ কুমার সাহা আরও বলেন, আমরা আশা করছি নতুন বছর থেকে চার মাস পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকবে। এতে কৃষকও বাঁচবে দেশের মানুষও বাঁচবে। পেঁয়াজের দাম কৃষক কিছুটা বেশি পাবে তবে আমাদের কখনও ২৫০ টাকায় পেঁয়াজ খেতে হবে না। আমরা পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবো। কোনো দেশের প্রতি চেয়ে থাকবো না। এবং ভবিষ্যতে আর পেঁয়াজ সংকট হবে না বলে তিনি আশা করেন।

পেঁয়াজ আমদানির ৯৫ শতাংশের বেশি আসে ভারত থেকে।এ ছাড়াও চীন, মিশর, পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে সামান্য পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়।

চলতি বছরের গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত প্রতি মেট্রিক টন পেঁয়াজের দাম ৮৫০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরে দেশের বাজারে ৩০০ টাকায় পর্যন্ত পেঁয়াজের দাম বাড়ে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্র (বিএআরআই-বারি) গাজীপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদার বলেন, আমরা নতুন নতুন পেঁয়াজের জাত উদ্ভাবন করছি। কৃষকেরা দাম পেলে শুধু শীতকাল নয়, গ্রীষ্মেও চাষ করবেন। দাম পাওয়ার কারণে অনেক জেলায় কৃষকেরা মুড়িকাটা পেঁয়াজ ঘরে তোলার পরে নতুন করে পেঁয়াজ চাষ করছেন। অর্থাৎ এক বছরে দুইবার পেঁয়াজ চাষ করছেন। কৃষকের এমন আগ্রহ অব্যাহত রাখার জন্য নতুন বছরে চারমাস পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকবে। পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্জন করার আগা পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে।

বিশ্বে পেঁয়াজ রপ্তানিতে শীর্ষে ভারত। এরপরেই রয়েছে মিয়ানমার, আফগানিস্তান, মিশর, তুরস্ক, চীন, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তান। বাংলাদেশে ১৩ লাখ পরিবার পেঁয়াজ চাষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের প্রায় সব জেলাতেই পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। অনেক জেলাতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের জমিতে নতুন করে পেঁয়াজ চাষ করছেন। এ উৎসাহ অব্যাহত থাকলে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কৃষি গবেষকেরা। শুধু শীতকাল নয়, পেঁয়াজের দাম পেলে কৃষকেরা গ্রীষ্মেও চাষ করবেন।


মন্তব্য লিখুন :