বাজেটে নগর দারিদ্র্য ও নয়া দারিদ্র্য উপেক্ষিত

নভেল করোনাভাইরাস মহামারী সারা বিশ্বকে এ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ১১ জুন অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ সালের বাজেট উত্থাপন করেছেন। ইতিমধ্যে করোনা মহামারীর কারণে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যা ২০.৪ শতাংশ থেকে ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, তিনটি কর্মসূচিতে উপকারভোগী বৃদ্ধি ছাড়া নগর দরিদ্র এবং করোনার কারণে সৃষ্ট নতুন দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ নেই। এছাড়াও সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন ও ডাটাবেজ করার জন্য পরিকল্পনা ও বরাদ্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সমস্যা তো রয়েছেই। ১৭ জুন ২০২০, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ আয়োজিত ‘২০২০-২১ বাজেট ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, চেয়ারম্যান, খাদ্য অধিকার  বাংলাদেশ ও পিকেএসএফ; ড. এ কে এনামুল হক, অধ্যাপক, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; ড. নাজনীন আহমেদ, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, বিআইডিএস; ড. সায়মা হক বিদিশা, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আলোচনাপত্র পাঠ ও সঞ্চালনা করেন মহসিন আলী, সাধারণ সম্পাদক, খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ ও নির্বাহী পরিচালক, ওয়েভ ফাউন্ডেশন।

এছাড়াও খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সহযোগী সংগঠন ও অন্যান্যদের মধ্যে আইসিসিও বাংলাদেশের আবুল কালাম আজাদ, আইসিডিএ’র আনোয়ার জাহিদ, সলিডারিটি’র হারুণ-অর-রশিদ লাল, বিসিএইচআরডি’র মাহবুব আলম, কেয়ার বাংলাদেশের আমানুর রহমান প্রমুখ।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, বাজেটের শিরোনামে মানুষ বাঁচানোর কথা বলা হলেও সামগ্রিকভাবে বরাবরের মতো প্রবৃদ্ধিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। জীবন ও জীবিকার বিষয়টি এখন মুখোমুখি। করোনার কারণে দীর্ঘদিন খাদ্য সাহায্য চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু আরো কিছুদিন তা অব্যাহত রাখতে হবে। বর্তমানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যার প্রতিফলন বাজেটে সেভাবে দেখা যাচ্ছে না।  

ড. এ কে এনামুল হক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক সতর্ক হয়ে সরকারকে ব্যয় করতে হবে। অতি দরিদ্র মানুষ করোনার কারণে দ্বিগুণ হলেও বরাদ্দের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন বাজেটে দেখা যাচ্ছে না। যদিও প্রতি বাজেটের বরাদ্দই খরচ হয় মূলত অর্থ-বছরের ছয় মাস পর থেকে। সরকারের সদিচ্ছার অভাব না থাকলেও আমাদের সামগ্রিক ব্যবস্থাতেই রয়েছে সমস্যা।

তিনি আরও বলেন, দরিদ্রদের জন্য স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ বরাদ্দ থাকা দরকার ছিল। বিশেষ করে করোনা টেস্টের খরচটা সরকার তাদের দিতে পারত। শুধুমাত্র ভাতা দিয়ে করোনাকালে দরিদ্র মানুষকে রক্ষা করা যাবে না। সেক্ষেত্রে তাদের সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত আচরণগত পরিবর্তন করতে হবে। তাহলেই মানুষ আস্তে আস্তে কাজে ফিরতে পারবে। এসব কাজে তাই সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এনজিওরা এক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। বাজেটে এর দিক-নির্দেশনা থাকতে পারত।

ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, এ বছর সামাজিক সুরক্ষা খাতে ১৪ হাজার কোটি টাকার বাড়তি বরাদ্দে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার, প্রবাসী আয়ের অংশ, বেসরকারি ব্যাংকের করোনাকালের সুদের অংশ ইত্যাদিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাহলে এগুলোকে ‘সুরক্ষা’ বলা যাবে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়। সামাজিক নিরাপত্তার উপকারভোগীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা অনুযায়ী সাহায্য দেয়া হয়, কিন্তু কর্মসূত্রে তিনি অন্য জায়গায় থাকতে পারেন। ফলে তিনি বঞ্চিত হচ্ছেন। এ প্রক্রিয়াটি সংশোধন করা দরকার। 

নগর দারিদ্র্যের বিষয়টি আলোচনায় উত্থাপন হওয়ায় বক্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, শহরের বস্তিবাসী দরিদ্রদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকা উচিত ছিল বাজেটে। জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যক্রমগুলো যত দ্রুত সম্ভব ডিজিটালাইজেশন করা দরকার। স্বাস্থ্যের পাশাপাশি খাদ্য ও পুষ্টি এ সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বের বিষয়। বিশেষ করে শিশুদের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। গ্রামীণ দরিদ্রদের জন্য ১০০ কোটি টাকা যে বরাদ্দ কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে তা খুবই অপ্রতুল এবং এখানেও নগর দারিদ্র্য উপেক্ষিত। সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রতাসাধন করতে হবে।  

আলোচনাপত্র উপস্থাপনকালে মহসিন আলী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে করোনা মহামারীর কারণে সর্বাধিক দারিদ্র্যপ্রবণ ১০০টি উপজেলায় সকল প্রবীণ ব্যক্তিকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা হবে, এর ফলে ৫ লক্ষ নতুন উপকারভোগী যোগ হবে। একইভাবে বিধাব ভাতায় যুক্ত হবেন ৩ লক্ষ ৫০ হাজার নতুন উপকারভোগী। প্রতিবন্ধী ভাতার আওতা ২ লক্ষ ৫৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৮ লক্ষ করা হবে। এই বাবদ বাড়তি ৭৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনটি কর্মসূচিতে কিছু উপকারভোগী ও বাজেট বৃদ্ধি করা হয়েছে।

করোনাকালে নগরে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অথচ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে যে ৭টি কর্মসূচি নগরের দরিদ্রদের জন্য পরিচালিত হয়, সেখানে বরাদ্দের পরিমাণ মাত্র ১ শতাংশ। এ খাতে মোট বরাদ্দের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের অবসর ও পারিবারিক অবসর ভাতা, চাকুরিরত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের পরিবারের জন্য অনুদান, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা এই উপখাতসমুহকে পৃথক না করায় কর্মসূচির জন্য নীট বরাদ্দ ও তার কার্যক্রম সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না।

এ প্রেক্ষিতে সরকারের উদ্যোগে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’-এর পক্ষে ১. নগর দরিদ্র এবং করোনায় আক্রান্ত নতুন দরিদ্রদের জন্য বাজেট বরাদ্দ করা; ২. এ অর্থ বছরের মধ্যে সকল অতিদরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর (যাদের অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র নেই) সঠিক তালিকা (ডাটাবেজ) নিশ্চিত করা; ৩. ২০২০-২১ অর্থবছেররর জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা; ৪. বর্তমান করোনা প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য বিষয়ে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর যথাযথ বাস্তবায়ন এবং উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের পাশাপাশি দল, মত নির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ; এবং ৫. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী, খাদ্য, চিকিৎসা ও প্রণোদনা সহ যেকোনো খাতে দুর্নীতি হলে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির বিধান নিশ্চিত করার সুপারিশ তুলে ধরেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন :