উচ্চ শিক্ষিত হয়েও, নামের পাশে শিক্ষিত বেকার

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের লাখো মেধাবী শিক্ষার্থী যখন উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরির প্রতিযোগিতায় নামে তাদের মধ্যে থেকে বেশ বড় একটি অংশকে বঞ্চিত হতে হয় চাকরি নামক এই সোনার হরিণ থেকে। যে কারণে দেশে বেড়েই চলেছে বেকারত্ব সমস্যা।

দেশে পর্যাপ্ত চাকরির ক্ষেত্র না থাকায় এবং অনেক সময় অনৈতিক উপায়ে কর্মী নিয়োগ দেওয়ার কারণে হতাশ হতে হয় এই সমস্ত শিক্ষিত যুবকদের। দেশের যে পরিমাণ উচ্চ শিক্ষিত মানুষ রয়েছে সেই পরিমাণে নেই কর্মসংস্থান। যেই কারনে লাখো যুবক-যুবতী ডুবে যায় বেকারত্ব নামক এই হতাশার অতল গহ্বরে ।

উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা মানেই কি চাকরি খোঁজা? শিক্ষিত হওয়া মানেই কি সরকারি, কর্পোরেশনের কিংবা অন্যের অফিসে চাকরি করা?

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় তার এক সমাবেশে বলেছেন, ‘উচ্চশিক্ষিত হয়ে চাকরি খোঁজা মানে নিজ পরিবারের ভরণপোষণের চিন্তা করা, এটি এক ধরনের স্বার্থপরতা।’ কথাটি কিন্তু একেবারে অযৌক্তিক নয়।

হ্যাঁ এটি সত্য যে, শিক্ষিত হওয়া কিংবা উচ্চশিক্ষিত হওয়া মানে বিশেষ কিছু দক্ষতা অর্জন করা যা দ্বারা তারা দেশি, বিদেশি কোনও সংস্থায় সার্ভিস দিয়ে অর্থ উপার্জন করা, যা দ্বারা নিজের পরিবারের ভরণপোষণ করা হয়।

জয় আরও বলেছেন, দেশে বিসিএসে মাত্র কয়েক হাজার পোস্ট অথচ প্রতিবছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স পাস করা শিক্ষার্থী বের হন, সবাই যদি সরকারি চাকরি খোঁজেন তাহলে জায়গা কোথায়? আসলেই ঠিক কথা।

আবার এটিও দেশে ঘটছে যে, হাজার হাজার বিদেশি তরুণ ও যুবক বাংলাদেশে কাজ করে তাদের নিজের দেশে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার পাঠাচ্ছে। এর শীর্ষে রয়েছে ভারত। তার অর্থ হচ্ছে- আমাদের দেশে যারা উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন, তারা সে ধরনের দক্ষতা অর্জন করছেন না। ফলে বিভিন্ন কর্পোরেট সেক্টর ও বেসরকারি সংস্থাকে বিদেশ থেকে লোক আনতে হচ্ছে। এখানেও চিন্তা করার বিষয় আছে। বিষয়টি কি আসলেই তাই? 

নাকি এটি একটি ফ্যাশন যে, আমাদের অফিসে বিদেশি আছে কিংবা রাজনৈতিক বা অন্য কোনও কারণে আমাদের অফিসে বিদেশি রাখা হচ্ছে। আমাদের দেশের তরুণরা বিদেশে গিয়ে প্রচুর সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন অথচ দেশে তাদের মূল্য নেই, এটি কী করে হয়? দক্ষতায় যে ঘাটতি রয়েছে, সেটি করার জন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আনতে হবে, তা ভাবতে হবে গভীরভাবে।

স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি পেলেও দেশে ভালো চাকরির নিশ্চয়তা নেই। উচ্চশিক্ষায় দুর্দান্ত ফল অর্জনকারীদের মধ্যে ২ থেকে সাড়ে ৩৪ শতাংশ বেকার। আবার যারা চাকরি পান, তাদের ৭৫ শতাংশেরই বেতন চল্লিশ হাজার টাকার নিচে।

উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের চাকরি, বেতন ও বেকারত্বের এ হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণায়। ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শিক্ষিতদের (এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী) এক-তৃতীয়াংশই বেকার। তাদের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকার বেশি অর্থাৎ যাদের পেছনে দেশ ও পরিবার বেশি অর্থ ব্যয় করেছে, তারাই বেশি বেকার। এ কেমন কথা?

মেধাবীদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি। সার্বিকভাবে শিক্ষিতদের মধ্যে ৩৩ শতাংশের বেশি বেকার। আর এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যারা প্রথম শ্রেণি পেয়েছে, তাদের মধ্যে বেকারত্ব ১৯ থেকে সাড়ে ৩৪ শতাংশ। বিশেষ করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রথম শ্রেণিপ্রাপ্তদের মধ্যে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশই বেকার। স্নাতক পর্যায়ে এমন মেধাবীদের বেকারত্বের হার প্রায় ২৮ শতাংশ।

এদিকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া প্রতি তিনজনের একজনই বেকার বসে আছেন। আর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে জিপিএ-৫ পাওয়াদের মধ্যে ৩১ শতাংশের বেশি বেকার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, কাজ-প্রত্যাশীদের মধ্যে সপ্তাহে ন্যূনতম এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজের সুযোগ না পেলে বেকার হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশে এমন বেকার ২৭ লাখ। বিআইডিএসের গবেষণায় বলা হয়েছে, স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ভালো ফলাফল করেও চাকরি মেলে না অনেক যুবকের।

মন্তব্য লিখুন :