বিশ্ব রাজনীতিতে বগুড়ার দই

অসাধারণ স্বাদের জন্য বিখ্যাত বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ বগুড়ার দই। প্রায় আড়াইশো বছর আগে থেকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ব্রিটেনে সুখ্যাতি ছড়িয়েছিল বগুড়ার দই। কথিত আছে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরাচার আইয়ুব খান বগুড়ার দইয়ের ব্যবহার করেছিলেন। তিনি ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মন পাবার জন্য উপহার পাঠিয়েছিলেন এই দই।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বগুড়া শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলায় দেশভাগের সময় কাল হতে বসতি শুরু করেন গৌরগোপাল ঘোষ। অতি কষ্টে জীবন যাপন করতে হলেও দই বানানোতে ছিল তার অনন্য দক্ষতা। এই দক্ষতাকে পুঁজি করেই তিনি শুরু করেছিলেন তার জীবনসংগ্রাম। হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বগুড়া শহরে এসে বিক্রি করতেন তার বানানো সুস্বাদু দই। দইয়ের সঙ্গে সরভাজাও পাওয়া যেত। নির্ভেজাল পণ্যমান এবং স্বাদের মাধুর্যের কারণে দিনে দিনে পণ্যগুলো এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠে যে, এই খবর সর্বত্র পৌঁছে যায়। শুরু হয় জনমনে দইয়ের অভিষেক।

বগুড়া জেলার সরকারি ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর বাবা নবাব আলতাফ আলী চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় ঘোষ পরিবার এই দই সার্বিক উন্নয়ন এবং উৎপাদন করেন। মোহাম্মদ আলীর বাড়ি বগুড়ার শেরপুরে।

অনেকেই ধারণা করেন, বগুড়ার দইয়ের বয়স প্রায় আড়াইশো বছর। আজকের বগুড়ার দইয়ের যে সুখ্যাতি ঘোষ পরিবারদের হাত ধরেই যে শুরু হয়েছিল তা বলা গেলেও,  এখন এই দই এর ব্যবসা অনেকেই করছেন। অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বগুড়ায় দই তৈরি ও বাজারজাত করছেন।

খাদ্যরসিক বাঙালির এই প্রসিদ্ধ দই এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল সুদূর ইংল্যান্ডে। ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ এই দইয়ের স্বাদ নিয়েছিলেন। ১৯৩৮ সালে বাংলার গভর্নর স্যার জন এন্ডারসন বগুড়া এসেছিলেন। বগুড়ার দই খেয়ে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি এই দই ইংল্যান্ডে রপ্তানি করার জন্য পরিকল্পনা নিয়েছিলেন।

ভারতেও বগুড়ার দইয়ের জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। জলপাইগুড়ির একটি বাণিজ্য মেলায়, বগুড়ার দই এর চাহিদা এতই বেড়ে যায় যে, তাৎক্ষণিকভাবে ১০ মেট্রিক টন অর্ডার পাওয়া যায়। তবে এত পরিমাণ দই সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। মাত্র ৫০০ কেজি দই পাঠানো হয়েছিল এবং লোকে লাইন ধরে দই ক্রয় করেছিলেন।

শ্যামলী, আকবরিয়া, মহরম আলী, সাউদিয়া, আরডিএ, শম্পা, জলযোগ, বৈকালী প্রভৃতি বগুড়ার উল্লেখযোগ্য দই। প্রত্যেকটি ব্র্যান্ডের দইয়ের স্বাদই অনন্য।

এখানে দই মূলত সরা হিসেবে বিক্রি হয়। একটি সরাতে ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম দই থাকে। মূল্য ১৮০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত হয়। এর বাইরেও দামি দই আছে। দইয়ের আবার বিভিন্ন প্রকারও আছে। টক দই, সাদা দই, চিনিপাতা দই, মিষ্টি দই, ডায়াবেটিস দই, ভিআইপি দই ইত্যাদি। বগুড়ার প্রসিদ্ধ এসব দই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে গিয়েছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে, পরিচিতি পেয়েছে বিশ্বদরবারে।

মন্তব্য লিখুন :