অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের ঋণ

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া হয়েছে ঋণ। শতকোটি টাকার ঋণ সুদসহ বাড়লেও সন্ধ্যান নেই প্রতিষ্ঠানের। অবৈধ কাগজে স্ত্রীর বড় ভাই ও ভাগনের নামে খোলা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নেওয়া হয় ১০০ কোটি টাকা, যা বেড়ে হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা।

নিজ স্ত্রীর বড় ভাই ও ভাগনের নামে কাগুজে কোম্পানি খুলে বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। তখন পি কে হালদার ছিলেন একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকার, আর তখন তাঁর মালিকানাধীন এফএএস ফাইন্যান্সের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম।

এফএএস ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে দ্রিনান অ্যাপারেলসের নামে বের করে নেওয়া হয় ১০০ কোটি টাকার ঋণ। এর মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্স থেকে ৪০ কোটি ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৬০ কোটি টাকা নেওয়া হয়। দুটো ঋণ যা এখন সুদসহ বেড়ে হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। বিষয়টি অবশ্য অস্বীকার করেননি জাহাঙ্গীর আলম।

তবে ওই টাকার কোনো অংশই বুঝে পাননি দ্রিনান অ্যাপারেলসের চেয়ারম্যান কাজী মমরোজ মাহমুদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু রাজীব মারুফ। এর মধ্যে কাজী মমরোজ মাহমুদ হলেন জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রীর বড় ভাই ও আবু রাজীব মারুফ সম্পর্কে ভাগনে। এখন পি কে হালদার পলাতক, এই টাকাও আদায় হচ্ছে না। তাই এফএএস ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সূত্রে এ তথ্য মিলেছে। অন্যদিকে যে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ গেছে, সেটির অস্তিত্বও সরেজমিনে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

পোশাক খাতের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন এফএএস ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান। যদিও তিনি এখন খেলাপি গ্রাহকদের একজন। ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে ব্যর্থ হওয়ায় গত সোমবার প্রতিষ্ঠানটির পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

নথিপত্রে দ্রিনান অ্যাপারেলসের ঠিকানা হলো ৩০, কারওয়ান বাজার, ঢাকা। এটি ডিজাইন অ্যান্ড সোর্স নামে জাহাঙ্গীর আলমের আরেক প্রতিষ্ঠানেরও ঠিকানা। আসলে দ্রিনান অ্যাপারেলস বলে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। ঋণ বের করতেই এ নামের কাগুজে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করা হয়েছিল।

কারওয়ান বাজারের নিজ কার্যালয়ে বসে সম্প্রতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এফএএস ফাইন্যান্সের কোনো ব্রোকারেজ হাউস ছিল না। দ্রিনান অ্যাপারেলসের ঋণের টাকা দিয়ে কেএইচবি সিকিউরিটিজ কেনা হয়। এটা এফএএস ফাইন্যান্সের কেনার কথা ছিল। তাঁকে (পি কে হালদার) নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। আর আমাকে না জানিয়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৬০ কোটি টাকা বের করা হয়েছে। এসব টাকার কোনো অংশ আমি পাইনি।’

দ্রিনান অ্যাপারেলসের ঋণের টাকায় কেএইচবি সিকিউরিটিজ কেনা হলেও নথিপত্রে এর মালিক ময়মনসিংহের রেপটাইল ফার্ম, রাজীব সোম ও শিমু রায়। এর মধ্যে রাজীব সোম ছিলেন এমডি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে পরিবার নিয়ে দেশ ছাড়েন রাজীব সোম। পি কে হালদারের আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের কথিত মালিক হলেন এই রাজীব সোম।

এফএএস ফাইন্যান্সের নথিপত্রে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের ২২ মার্চের পর্ষদ সভায় দ্রিনান অ্যাপারেলসের নামে ৪০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন হয়। প্রতিষ্ঠানটিকে পোশাক ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য এ ঋণ দেওয়া হয়। এ ঋণের বিপরীতে অবসায়নের সিদ্ধান্ত হওয়া পিপলস লিজিংয়ের ১ কোটি ৪৩ লাখ ১৭ হাজার ৫২২টি শেয়ার জামানত রাখা হয়। পরে জামানত পরিবর্তন করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রহমান কেমিক্যালের ৮ লাখ ৫৮ হাজার ও ময়মনসিংহের ভালুকার ১০২ শতক জমি বন্ধক দেওয়া হয়। ভালুকার ভূমি নিবন্ধন কার্যালয়ের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ জমির মালিক পি কে হালদার। অর্থাৎ ঋণটি বের করা হয় জাহাঙ্গীর আলমের সরবরাহ করা কাগুজে মালিক ও পি কে হালদারের জমি ব্যবহার করে। আর একই নথিপত্র ব্যবহার করে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৬০ কোটি টাকা বের করা হয় বলে দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে জাহাঙ্গীর আলমের নিজের নামে নেওয়া ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি ঋণ পুনঃ তফসিলের জন্য টাকা জমা দিয়েছি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দীর্ঘদিন ফাইল আটকে রেখেছে। এ জন্য এখনো খেলাপি হিসেবে রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, এফএএস ফাইন্যান্সকে এখনো ভালো করা সম্ভব।’

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের পরে এফএএস ফাইন্যান্সের মালিকানা পরিবর্তন, ঋণ ও লিজে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি, পরিশোধিত মূলধন দ্বিগুণ বৃদ্ধি ও অন্যান্য সূচকের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে বর্তমান আর্থিক অক্ষমতা বা দৈন্য দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারে নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৫২০ শতাংশ বেশি অর্থায়ন করেছে। সূত্র: প্রথম আলো

মন্তব্য লিখুন :