রোহিঙ্গা হত্যা: ৩ সপ্তাহ আগে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ

রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে হত্যা, গুম বা অপহরণ করা হতে পারে বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল।

সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের তিন সপ্তাহ আগে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহর প্রাণনাশের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খুনিরা এর আগেও বেশ কয়েকবার তাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। যে কোনো সময় তাকে হত্যা করা হতে পারে।

ওই প্রতিবেদনের পর মুহিবুল্লাহর গতিবিধির ওপর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। কিন্তু ক্যাম্পের ভেতর তার অফিসে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়নি। আর এ দুর্বলতার সুযোগে তাকে অফিসে হত্যা করা হয়েছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে ছিল মিয়ানমার। এ চাপ সামলাতে এবং বাংলাদেশকে চাপে ফেলতে আরসা সদস্যদের দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। মুহিবুল্লাহ হত্যার পর থেকে সন্দেহভাজন ১২ রোহিঙ্গা পলাতক। তাদের সবাই আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মির (আরসা) সদস্য। মিয়ানমারই তাদের পাঠিয়েছিল। মিশন শেষে তারা মিয়ানমারেই পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মিয়ানমার সরকারের শত শত এজেন্ট রয়েছে। ওই দেশের সরকারই তাদের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠায়। তারা গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে মিয়ানমার সরকারকে সরবরাহ করে।

যখনই কেউ এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায় তখন সে আর বেশিদিন ক্যাম্পে থাকে না। পরিবার নিয়ে মিয়ানমার চলে যায়। মূলত মিয়ানমার সরকারকে তথ্য দেওয়ার পরীক্ষায় পাশের পরই তাদের স্থান হয় মিয়ানমারে। এভাবে এজেন্টরা যাওয়া-আসার মধ্যেই থাকে। তাদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে আসছে অস্ত্র, ইয়াবা ও আইসসহ নানা ধরনের চোরাচালান।

বাংলাদেশের সীমান্ত ঘিরেই মিয়ানমার গড়ে তুলেছে ইয়াবার কারখানা। মাদক এবং অবৈধ চোরাচালানের টাকা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে যায় পণ্য এবং হুন্ডির মাধ্যমে। এছাড়া মিয়ানমারের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও ক্যাম্পে অবাধে যাতায়াত করছে।

তারা ক্যাম্পে ঢুকছে ‘বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা’ হিসেবে। সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা অনেক বেশি। সে অনুযায়ী বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষীর সংখ্যা কম। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইলে ওই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাধা দেয় না। উলটো সহযোগিতা করে। এসব কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প হয়ে উঠেছে অরক্ষিত।

২৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে নিজ সংগঠনের কার্যালয়ে অবস্থানকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ। ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া থানায় একটি মামলা করেন তার ছোট ভাই হাবিব উল্লাহ। এ ঘটনার ১৫-২০ দিন আগে থেকেই আরসা সদস্যরা মুহিবুল্লাহকে হুমকি দিয়ে আসছিল। মুহিবুল্লাহ নিজেও হত্যা, গুম ও অপহরণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগে তৈরি করা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, মুহিবুল্লাহ হলেন মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনে সোচ্চার কণ্ঠ। তার ডাকে রোহিঙ্গারা একজোট হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও তিনি দেখা করেছেন।

প্রত্যাবর্তনে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের জন্য তিনি হয়ে উঠেছেন আশা-ভরসার মূর্ত প্রতীক। আরসাসহ কয়েকটি গ্রুপের টার্গেটে আছেন তিনি। আরসা মূলত মিয়ানমার সরকারের পক্ষে কাজ করছে। প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান মিয়ানমার সরকারের বিরোধী হলেও তারা মূলত সরকারের এজেন্ট হয়েই কাজ করছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা প্রবেশের ক্ষেত্রেও আরসার বড় ভূমিকা আছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২১ জুলাই থেকে উগ্রপন্থি রোহিঙ্গা সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কার্যক্রম শুরু করে। পরে আরএসও’র কয়েকজন সদস্যকে অপহরণ করে গুলি করে কথিত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সংগঠন আরসা।

আরসার কার্যক্রমকে মুহিবুল্লার সংগঠন এআরএসপিএইচসহ কয়েকটি সংগঠন সমর্থন করে না। তারা আরসার কার্যক্রমের প্রতিবাদ জানাতে থাকে। এ বিষয়টিকে ঘিরে মুহিবুল্লাহসহ বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা হত্যা, গুম ও অপহরণের শিকার হতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

মন্তব্য লিখুন :