নান্দনিকতার ছোয়ায় সুনামগঞ্জের হাওর বিলাস

হাওর-নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুনামগঞ্জ। টাঙ্গুয়ার হাওর, যাদুকাটা নদী, দেশের সর্ববৃহৎ শিমুল বাগান, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ লেক, ডলুরা শহীদ স্মৃতিসৌধ, বাঁশতলা শহীদ মিনারসহ জেলার অনেক এলাকা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর।

কিন্তু সরকারিভাবে এসব পর্যটনষ্পটগুলোর কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও পর্যটনের উন্নয়নে বিশেষ কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সল্প সময়ে কয়েকটি পর্যটনষ্পট গড়ে তোলে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছেন জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সাদি উর রহিম জাদিদ।

জানা যায়, হাওর ও নদীর সীমান্ত উপজেলা বিশ্বম্ভরপুর। ২৪৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের উপজেলার জনসংখ্যা এক লাখ ৫৩ হাজার। প্রধান ফসল কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য। মো. সাদি উর রহিম জাদিদ গত বছরের ১ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদে যোগদান করেন। এরপর মুজিববর্ষের দরিদ্রদের জন্য ঘর তৈরির জমি খোঁজতে গিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নজরে পড়ে তাঁর। এরপর ওই এলাকায় পর্যটন বিকাশের উদ্যোগ নেন।

সীমান্তের সলুকাবাদ ইউনিয়নের চ্যাংবিল এলাকার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে আন্তর্জাতিক সীমা রেখার পাশে ‘পাহাড় বিলাস’ নামে পর্যটনষ্পট গড়ে তোলেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুরোধে এলাকার আবু সুফিয়ান নামের একজন পর্যটনের জন্য ১০ শতক জমি সরকারকে দান করেন। সাদা রংয়ের দৃষ্টিনন্দন কাঠের বেড়া দিয়ে পাহাড় বিলাসে পর্যটকদের বসার জন্য ৮টি বেঞ্চ, পর্যটকদের হালকা খাবারের দুইটি দোকান, ছনের দুইটি গোলঘর নির্মাণ করেন। এরপর প্রতিদিনই শতশত মানুষ সেখানে বেড়াতে যাচ্ছেন।

গ্রাম থেকে আসা বিভিন্ন দপ্তরে সেবাপ্রার্থীদের জন্য উপজেলা পরিষদের সামনে গাছের নিচ ৫টি গোলঘর করে ‘সেবাচত্ত্বর’ নির্মাণ করেন। প্রতিটি গোলঘরে ৭/৮ জন করে মানুষ বসতে পারেন। উপজেলা সদরে যাত্রীদের জন্য একটি যাত্রী ছাউনি ‘নিকুঞ্জ’ ও সাধারণ মানুষের হেটে চলার জন্য থানার সামনে থেকে উপজেলা পরিষদের শেষ সীমানা দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করেছেন।

পাহাড় বিলাস গড়ে তোলার পর পর্যটকদের উৎসাহে উপজেলা সদরের পাশে করচার হাওরের পরিবেশ উপভোগ করার জন্য পানির উপরে ভাসমান দুইটি গোলঘর নির্মাণ করে ‘হাওর বিলাস’, উপজেলার প্রবেশদ্বার কারেন্টেরের বাজার এলাকায় করচার হাওরের বোয়াল মাছের ন্যায় মাছের ভাষ্কর্য দিয়ে ‘বোয়াল চত্ত্বর’ ও সরকারি জমিতে করচার হাওরের নামে ‘করচারপাড় মাকেটর্’ নির্মাণ করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার।

সম্প্রতি ‘হাওর বিলাস’, ‘বোয়াল চত্ত্বর’ ও করচারপাড় মাকের্টের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। লকডাউন থাকলেও স্থানীয় লোকজন ‘পাহাড় বিলাস’, ‘হাওর বিলাস’, ‘বোয়াল চত্ত্বর’ দেখতে যাচ্ছেন।

স্থানীয় লোকজন জানান, পাহাড় ও হাওরের পরিবেশ উপভোগ করতে অতীতে এভাবে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেন নি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জনপ্রতিনিধিগণ। এছাড়া বর্তমান উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাওর-নদীর জেলায় এই প্রথম হাওরের মাছের দৃষ্টিনন্দন ভাষ্কর্য স্থাপন করে একটি চত্ত্বরের নামকরণ করেছেন। সৌন্দর্য পিপাসুরা এসব দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। এলাকার লোকজনের সুবিধার্থে হাওরের নামে একটি মার্কেট নির্মাণ করে দিয়েছেন তিনি।

আবু তালহা বিন মনির নামের একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন,‘আপনাদের কক্সবাজার এর সমুদ্র সৈকত এর অনুভূতিটুকু দিতে পারব না। দিতে পারব না বিশাল জলরাশির সু-উচ্চ ঢেউয়ের মেলা। তবে আপনাদের হৃদয় পুলকিত করতে আমাদের কোনো কমতি থাকবে না। ভরা বর্ষার কোনো এক শ্রেষ্ঠ বিকেলে চলে আসুন আমাদের এ ক্ষুদ্র প্রয়াস ‘হাওর বিলাসে’। জলে ডুবন্ত সূর্যাস্ত অবশ্য অবলোকন করতে পারবেন না। কিন্তু শান্ত এক মনোরম বিকেলে গোধূলী লগ্নের মৃদু বাতাস আপনার হৃদয়কে প্রকম্পিত করবে তা বলতে পারি। নিশ্চিত হয়ে এটা বলতে পারি ঐ অদূর পানে তাঁকিয়ে আপনার মুখ থেকে বের হবে কি অপরূপ সৃষ্টি।’

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাদাঘাট দক্ষিণ ইউনিয়নের বাগগাঁও-সিরাজপুর গ্রামের বাসিন্দা হুমায়ুন কবির বলেন,‘বর্তমান উপজেলা নির্বাহী অফিসার একজন কাজের লোক। তিনি বেশকিছু দৃষ্টিনন্দন কাজ করেছেন। এলাকার মানুষ এসব কাজের প্রশংসা করছেন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছেন। আগে বিশ্বম্ভরপুরে এমন কাজ কেউ করেননি। এছাড়াও সাধারণ মানুষ তাঁর কাছে কথা বলার সুযোগ পান।’

কৃষ্ণনগরের স্বপন কুমার বর্মন বলেন,‘বর্তমান উপজেলা নির্বাহী অফিসার উপজেলার সৌন্দর্যগুলো ফুটিয়ে তোলছেন। স্বল্প অর্থায়নে দৃষ্টিনন্দন কাজ করছেন তিনি। তাঁর প্রচেষ্টায় নান্দনিকতার ছোয়া লেগেছে বিশ্বম্ভরপুরে। হাওর বিলাস, পাহাড় বিলাসের মাধ্যমে এলাকার লোকজন হাওরও পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ পাচ্ছেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন ।’

সুনামগঞ্জ শহরের নতুনপাড়ার বাসিন্দা কবি কুমার সৌরভ বলেন,‘সদিচ্ছা ও শিল্পমন থাকলে একটি এলাকাকে কীভাবে সুন্দর করা যায় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বিশ্বম্ভরপুর। বর্তমান উপজেলা নির্বাহী অফিসার এখানে এসেছেন মাত্র ৮ মাস। এই সময়েই তিনি উপজেলার পর্যটন সম্ভাবনাকে মাথায় নিয়ে কাজ শুরু করেন। চ্যাংবিলে পাহাড়বিলাস, কারেন্টের বাজারে বোয়ালচত্ত্বর, উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন করচার হাওরে হাওর বিলাস, উপজেলা পরিষদে সেবাচত্বর ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে উপজেলাকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছেন।

এসবের মধ্য দিয়ে বিশ্বম্ভরপুরের চিরাচরিত প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য এখন অনেকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। অনেকে সৌন্দর্যপিপাসু পরিব্রাজক এখন বিশ্বম্ভরপুরমুখী হয়েছেন। একজন প্রাসনিক কর্মকর্তার এমন শৈল্পিক উন্নয়ন আমাদের মুগ্ধ করেছে। সুনামগঞ্জের আনাচে কানাচে এমন বহু জায়গা রয়েছে যেগুলো নিয়ে কাজ করলে শেষ হবার নয়।

মন্তব্য লিখুন :