সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্ব ও সমস্যার দিক

পেশা হিসেবে সংবেদনশীলতা সাংবাদিকতাকে অন্য সকল পেশা থেকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে সুস্থিরভাবে উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে সুনিপুণভাবে আসল ঘটনা পরিস্কার করা সাংবাদিকতার মাধুর্য। সাংবাদিকতা দেশের ও জাতির দর্পণ স্বরূপ। সাংবাদিকতা যেমনি মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করে তেমনি এর একটি ভুল সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আনতে পারে চরম দুর্ভোগ।

প্রত্যেক পেশাজীবি ব্যাক্তিকে তার পেশার নিজস্ব রীতি-নীতি, বৈশিষ্ট্য ও মূল্যবোধের সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে নিজ পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হয়। সাংবাদিকতাও এ নিয়মের বাইরে নয়। সাংবাদিকতা শাস্ত্রের পণ্ডিতগণ মনে করেন, একজন পেশাদার সাংবাদিককে অবশ্যই সংবাদ সংগ্রহ, লিখন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে যেমনি দক্ষতা প্রদর্শন করতে হয়, তেমনি মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের সুষ্ঠু প্রয়োগও অপরিহার্য। আর এগুলোর ঘাটতি থাকলে সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যায়।

সাংবাদিকতার বিভিন্ন সমস্যাবলি

*রাজনৈতিক ও আইনি হস্তক্ষেপ :

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হচ্ছে সাংবাদিকতা। কিন্তু বর্তমানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপে গণমাধ্যমকে ক্ষমতাধরদের সামনে নিচু হতে দেখা যায়। পেশাদারি সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক হলো– অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ যতই বাড়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ততই কমতে থাকে। এছাড়াও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে জন্ম হয় সেলফ্ সেন্সরশিপের। এতে ব্যাক্তি নিজেই গোপন কোন তথ্য যা দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো বড় ব্যাক্তির বিপক্ষে যায় তা প্রকাশ করতে ভয় পায়।

ইতিহাসে শাসকগণ সর্বকালেই কোণঠাসা করে রেখেছে এই গণমাধ্যমকে। উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্র হিকির গেজেট কিংবা বাংলা অঞ্চলের প্রথম সংবাদপত্র রংপুর বার্তাবহ শাসকদের রোষানলে পড়েই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গণমাধ্যম বন্ধের এই সংস্কৃতি ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশে সব সময়েই বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬ তম। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা, তাদের ভালো দিক কিংবা খারাপ দিক এবং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় সরকার দলকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি দেশের সকল জনগণকে তাদের রাষ্ট্রের সুন্দর অবস্থান নিশ্চিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। গণমাধ্যম সকল নাগরিকের অভিভাবক। গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় সকল ধরনের হস্তক্ষেপকে পদানত করে এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই দেশে সুস্থ গণতন্ত্র, মানুষের নিরাপত্তা ও দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

*নৈতিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতা :

নৈতিকতা ব্যাক্তি সাংবাদিকের জন্য যেমন দরকার তেমনি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যাবশকীয়। কিন্তু সাম্প্রতিককালে গুজব বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে সংবাদ পরিবেশন, তথ্যের বিকৃতি করা, তথ্য ও নিজস্ব মতামতের মিশ্রণ, ভাষাগত ত্রুটি, সংবাদের নামে বিজ্ঞাপন– এসব মৌলিক নৈতিকতার স্খলন সাংবাদিকতায় বেড়ে চলেছে।

একজন সাংবাদিকের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে বস্তুনিষ্ঠাভাবে সত্য উদঘাটন করা এবং নির্ভুলভাবে তা পাঠক বা দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়া। বর্তমানে দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কারণে ভুল তথ্য বেড়ে চলেছে। বস্তুনিষ্ঠতা পেশাদারি সাংবাদিকতার প্রধান নির্ণায়ক উপাদান।

সাংবাদিকদের নিজ জায়গা থেকে সকল ধরনের পক্ষপাতকে না বলে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে তথ্য প্রকাশ করতে হবে। জনসাধারনকে বিভ্রান্ত করে এমন গুজব যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে সংবাদ প্রকাশ করতে হবে।

*সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ :

সাংবাদিকতায় যেমনি দরকার বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান তেমনি প্রয়োজন ব্যবহারিক দক্ষতা। এ দুটোর সমন্বয় ব্যাতিত ভালো সাংবাদিক হওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংবাদিকতা বিভাগ ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে এখনও শিক্ষানবিশ সাংবাদিকদের উপযুক্ত, উন্নত ও প্রযুক্তিগত সুবিধা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

সঙ্কট থাকলেও অনেক সময় পেশাকে সমৃদ্ধ করা যায় যদি প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া যায়। দরকার হয় একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী উদ্যোগ। তাই সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্বের সঙ্কট মোকাবেলায় সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সাময়িক সঙ্কটগুলো কাটিয়ে উঠা সম্ভব।

 

শোয়াইব আব্দুল্লাহ

স্নাতক অধ্যয়নরত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি, ঢাকা নিউজ ৭১.কম




মন্তব্য লিখুন :